পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৮৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

সেই প্রতিবাখতিনকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় সফল অন্তর্ঘাতক বলে প্রমাণ করতে চান। মার্ক্সীয় ভাবনার পরিমণ্ডলকে যাঁরা রুদ্ধ পরিসরের অচলায়তন বলে নিন্দা ও প্রত্যাখ্যান করেন—কার্যত তাঁরাই মতান্ধ ও নিরন্ধ্র স্থবিরতার উপাসক। অথচ বাখতিন সৃজনশীল ভাবে মার্ক্সীয় চেতনার পরিধিকে বিকশিত করে গেছেন; তাঁর এই পরিশীলিত বৈদগ্ধ্য ও অনুভূতির নিবিড়তা ঐসব তথাকথিত তাত্ত্বিকদের মনের অন্ধকার কাটাতে পারেনি।

 মেডভেডেভ/বাখতিনের The Formal Method in Literary Scholarship: A Critical Introduction of Sociological Poetics বইটি প্রকরণবাদের সঙ্গে মার্ক্সীয় বীক্ষণের দ্বিবাচনিক মিথষ্ক্রিয়ার ফসল। সাহিত্যের সঙ্গে ব্যবহারিক ভাষার বিচ্ছেদ মেনে নিলে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বস্তু, মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে লিখন-প্রক্রিয়া, সমালোচনা ও তাৎপর্য-সন্ধানের বৈদগ্ধ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য। মেডভেডেভ/বাখতিন দেখিয়েছেন, নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের আবহে সমস্ত লেখা জন্ম নেয় এবং বিকশিত হয়; সাহিত্যের পরিধির ভেতরে ও বাইরে উপস্থিত মূল্যবোধকে কখনো মেনে নেয় প্রতিটি মানবিক উচ্চারণ কখনো বা বিরোধিতা করে। পার্থক্য ও সমান্তরালতার দ্বিবাচনিকতাকে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার আবহে প্রয়োগ করে লেখক দেখিয়েছেন, অন্তর্বস্তু ও প্রকরণের তুলনামূলক গুরুত্বকে বুঝতে হবে ভাবাদর্শের সামগ্রিকতায়—‘within the bounds of the unified sociological laws of development’ (তদেব: ২৯)। অর্থাৎ দ্বন্দ্ববাদের নিষ্কর্ষকে সাহিত্য ও ভাবাদর্শপ্রসূত প্রকরণের সম্পর্ক বোঝাতে কাজে লাগিয়েছেন। মেডভেডেভ/বাখতিনের মূল আকল্প হলো: ‘The language of art is only a dialect of a single social language’ (তদেব: ৩৬)।

 ভোলোশিনোভ/বাখতিনের Freudianism: A Marxist Critique বইতে এই যুক্তিবিন্যাস আরো একটু প্রসারিত হয়েছে। অবচেতনা সম্পর্কে ফ্রয়েডীয় ধারণাকে অন্তর্বৃত সামাজিক ভাষার নানা পরস্পরবিরোধী ও বহুস্বরিক বিভঙ্গের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এখানে। মনস্তাত্ত্বিক জীবনকে সামাজিক বর্গায়তনের দ্বিবাচনিকতায় প্রতিস্থাপন করে লেখক মানবিক বাচনের নতুন দ্যোতনা আবিষ্কার করেছেন যেন। তাঁর প্রণিধানযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো: ‘Only as a part of social whole, only in and through a social class, does the human person become historically real and culturally productive.’ (তদেব: ১৫) স্পষ্টতই এই বক্তব্য মার্ক্সীয় চেতনার ফসল। তেমনি Marxism and the Philosophy of Language বইতে ভোলোশিনোভ/বাখতিন নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, সামাজিক জীবনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অর্জিত জীবনের অভিজ্ঞতা চিহ্নায়কের নিয়ন্তা এবং সেইজন্যে যাবতীয় মানবিক তাৎপর্যের সূত্রধার। শুধু যে বাস্তবতার যথাপ্রাপ্ত অংশ হিসেবে চিহ্নায়ক সক্রিয় থাকে, তা-ই নয়; সমান্তরাল ভাবে বিদ্যমান অপর বাস্তবতার বিচ্ছুরণও ঘটে ঐ চিহ্নায়ক থেকে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ভাবাদর্শপ্রাণিত দৃষ্টিকোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোলোশিনোভ/বাখতিন লিখেছেন: “Every sign is subject to the criteria of ideological evaluation (i.e., whether it is true, false, correct, fair, good etc.). The domain of ideology coincides with the domain of signs. They equate with one another. Whenever a sign is present, ideology is present,

৮২