পাতা:বাখতিন - তপোধীর ভট্টাচার্য.pdf/৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

দুই

তাই প্রতীচ্যায়িত উপন্যাসের দর্পণে উনিশ শতকের নব্য আলোকপ্রাপ্ত বর্গ যখন নিজেদের কাঙ্ক্ষিত প্রসাধনধন্য ও অলংকৃত চেহারা দেখতে পেয়ে তৃপ্ত, কল্পিত আকাশে ইচ্ছাপূরণমূলক ভ্রমণের বিবরণে মুগ্ধ—বিস্মৃত ভূমির সঙ্গে সংলগ্ন সামূহিক জীবনের পরম্পরার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে ঐতিহাসিক ভাবেই অনিবার্য হয়ে পড়েছিল লোকায়তের প্রত্যাঘাত। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের কঙ্কাবতী (১৮৯২) সেই পাঠকৃতি যার কোষে-কোষে ‘folk carnival humour’ -এর প্রগাঢ় উপস্থিতি লক্ষ করি। রাবেলের অণুবিশ্বে বাখতিন যেমন দেখতে পেয়েছেন ‘boundless world of humourous forms and manifestations (which) opposed the official and serious tone of medieval ecclesiastical and feudal culture’—তেমনি আমরাও কঙ্কাবতী-র অণুবিশ্ব জুড়ে একদিকে দেখতে পাই সামন্ততন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মতন্ত্রের বীভৎস গলিত প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র। অন্যদিকে দেখি তাদের নিষ্ঠুর বেপরোয়া আধিপত্যবাদী আকরণের প্রতিস্পর্ধী অজস্র অস্তিত্বের মিছিল। ফাঁপা সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, তাদের কেউ মানুষ নয়। যেন মানুষের অবয়বে অতিব্যক্ত পাশবিকতার প্রতি তর্জনি সংকেত করার জন্যে হাসির আড়ালে জীবনের মর্মসত্য (‘প্রতিটি সত্তাই সহযোগী সত্তা’: বাখতিন) প্রকাশ করেছে জন্তু-সরীসৃপ-কীট-পতঙ্গ-ভূত-পেত্নীর ছদ্মবেশধারী কুশীলবেরা। এরা সবাই আকারে-প্রকারে স্বভাবে-অভিব্যক্তিতে কার্নিভালের অন্তহীন হাস্যময় ভুবনের প্রতিনিধিত্ব করেছে। বাখতিন-কথিত বিপ্রতীপায়নের অসামান্য দৃষ্টান্ত পাচ্ছি ত্রৈলোক্যনাথের প্রতিবেদনে। মানুষ ও মানবেতর প্রাণীর (এবং, বাস্তব ও প্রকল্পনার) এমন পারস্পরিক ভূমিকা-বদল কার্নিভালের সৃষ্টিশীল সম্ভাবনারই প্রমাণ।

 ঠিক ১০১ বছর পরে প্রকাশিত নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট (১৯৯৩) যেন বাংলা সাহিত্যে অবক্ষয়ী আধুনিকতাবাদ ও উন্মুখ আধুনিকোত্তরবাদের সন্ধিলগ্নে ‘urban carnival humour’-এর দৃষ্টান্ত। ত্রৈলোক্যনাথে ছিল উনিশ শতকীয় ঔপনিবেশিক আধুনিকতার কাহিনী-গ্রন্থনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ছিল বাস্তবতার নামে ছদ্ম-বাস্তব চাপিয়ে দেওয়ার সুবিধাবাদী রীতির বিরুদ্ধে দ্রোহ। আর, নবারুণ বিশ শতকের উপার্জন বলে প্রচারিত যাবতীয় ধূর্ততা-কৃত্রিমতা-অন্তঃসারশূন্যতা ভরা কাহিনি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে অস্বীকার করেছেন। নয়া-ঔপনিবেশিক প্রতাপকে প্রত্যাঘাত জানানোর জন্যে তিনি বেছে নিয়েছেন হার্বার্ট সরকার নামক এক নাগরিক অন্তেবাসীকে। তার জীবন যতটা গোলমেলে ও শ্লেষগর্ভ, মৃত্যু তার চেয়েও বেশি। ‘কাহিনি’ শব্দটাই যখন চরম অবাস্তব, নবারুণ তাকে পুরোপুরি বিনির্মাণ নয় কেবল—তীব্র পরিহাসেও বিদ্ধ করেছেন। তাঁর এই আকরণোত্তর গ্রন্থনার অন্তঃস্বর সম্পর্কে লেখক কতখানি সচেতন, তা হারবার্টের মৃত্যু ও পরবর্তী বর্ণনায় স্পষ্ট: ‘হঠাৎ তালে তালে হাততালি দেওয়া শুরু হয়। সঙ্গে সিটি ও নানারকম বিদ্‌ঘুটে আওয়াজ। এইভাবে শোক অন্তিম রিচুয়ালের মাধ্যমে ব্যাপকতর আনন্দময় কোলাহলে পরিণত হতে থাকে। ... গেটের পাশেই ক্রন্দনশীলা শোভারানীর পাশে বিমূঢ় ললিতকুমার দাঁড়িয়েছিলেন। আনন্দধ্বনি শুনে তিনি বলে উঠলেন, শোভা, তুমি কাঁদছ? এ তো দেখছি কার্নিভাল।’ (পৃ. ৫৫) যেভাবেই উচ্চারিত হোক না কেন

৮৯