পাতা:বাগেশ্বরী শিল্প-প্রবন্ধাবলী.djvu/১৮৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
১৭৯
শিল্পের ক্রিয়া প্রক্রিয়ার ভাল মন্দ

 আর্ট স্কুল থেকে যে একেবারেই আর্টিষ্ট বার হয় না তার কারণ আমি দেখেছি—সেখানে ছেলেগুলো খেটেই চলে বাঁধা নিয়মে, খেটে চলার আনন্দ বোধ করবার অবসর কেউ সেখানে দেয় না, কলের মতো হাত হ'য়ে ওঠে পাকা ছবি মূর্তি ইত্যাদি তৈরী করবার প্রকরণে কিন্তু মন থেকে যায় উপবাসী অপ্রসন্ন। বেশী দিন উপবাসে রাখলে পেটের খিদে মরে যায়; বত্ৰিশ পাটি দাঁত চিবোতে পাকা হয়ে উঠলে, কিন্তু খিদে মরে গেল, এই দুর্ঘটনা ঘটছে আর্ট স্কুলের শতকরা নিরানব্বইটা ছাত্রের। সবাই বার হয় প্রকরণিক হ’য়ে, কচিৎ কেউ সেখান থেকে আসে আর্টিষ্ট হয়ে। মন নেই কাজ করে' চলেছে হাত কলের মত, সে কায দেখে তারি মন খুসী হয় যে ফুলকে ফোটায়নি ফুটতে দেখেনি এবং যার বুকে রস ফোটেনি কোনদিন।

 গড়া হ’য়ে গেলে হাতের কায তো আর্টিষ্টের হাতে থাকে না। অন্যে নিয়ে সেটা উপভোগ করে। আর্টিষ্ট যে জনয়িতা নিজের জনিত আর্ট ভোগ করা তার ধর্ম নয়, তার সৃষ্টি করার প্রকরণের মধ্যে যেটুকু আনন্দ সেই টুকুই আর্টিষ্টের প্রাপ্য, কাযের আরম্ভ থেকে শেষ এইটুকুর মধ্যে তার সমস্তটুকু নিঃশেষ করে' পায় আর্টিষ্ট; সৃষ্টি করা শেষ যেমনি হ’ল অমনি কাযটির সঙ্গে আর্টিষ্টের হাতে কলমে যোগ বিচ্ছিন্ন হ’ল। আর্টিষ্ট এসে পড়ল দর্শকের জায়গায়, সবার পাশে সেও দাঁড়িয়ে চেয়ে দেখলে আপনার কাযের দিকে, অন্যে সেটা নিয়ে গেল কি ফেলে গেল তা দেখবার অপেক্ষা নেই, আর্টিষ্ট সে ফিরে এল নতুন একটা কাযের প্রক্রিয়ার মধ্যে। এই তো হ’ল আর্টিষ্টের প্রতি পলের জীবন—সে শুধু বাঁচে তার কায করে’, চলার মধ্যে যে আনন্দ তাই নিয়ে, আনন্দের সেই এক মুহূর্তে তারি ছাপ পড়ে তার কাযে কর্মে সবদিক দিয়ে, তার সৃষ্টি ছন্দ পায় ছাঁচ পায় ঐ এক বিন্দু আনন্দের কোলে। কলের নাগরদোলায় ছেলেগুলো দুলছে আর মায়ের কোলে ছেলে দুলছে,—এ দুই-ই তো দেখেছি। কল সে দুলিয়ে আনন্দ পাচ্ছে না, কাযেই সে কোঁচ কোঁচ শব্দে জানিয়েই চলেছে সে কথা, আর মায়ে দোলা দিচ্ছে দিনের পর দিন রাতের পর রাত, তাতেও ত দুঃখ রয়েছে কিন্তু বেসুর কোথাও তো নেই। মা গাইছে “আমার ছেলে আমার কোলে, গাছের পাখী গাছে দোলে”, দোলাবার শ্রম সেখানে প্রতিমুহূর্তে সুরে ভরছে, মিটিয়ে দিচ্ছে দুঃখ দোলা দেবার আনন্দ-