পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/১০৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

৯৮

ভগবতী দেবী

 অহঙ্কার ভগবতী দেবীর হৃদয় স্পশ করিতে পারে নাই। ধনমদে তাঁহাকে গর্ব্বিত করিতে পারে নাই। দয়া তাঁহার প্রকৃতিসিদ্ধ ধর্ম ছিল। অনুগত-প্রতিপালন ও আশ্রিতবাৎসল্য, তাঁহার স্বভাবকে মধুময় করিয়াছিল।

 তাঁহার চরিত্রের আর এক মাহাত্ম্য, তাঁহার প্রফুল্লচিত্ততা। ফলতঃ প্রফুল্লচিত্ততা সূর্য্যালোকস্বরপ। এই আলোক দ্বারা চিত্তক্ষেত্র উদ্দীপ্ত হইলে, আমরা মানব জীবন যেরূপ সার্থকতার সহিত উপভোগ করিতে পারি, এমন অন্য কিছুর সাহায্যে পারি না। প্রফুল্পচিত্ত ব্যক্তির নিকটে জগতের সামান্য পদার্থও সুন্দর ও সুখকর। যিনি সতত প্রফুল্লচিত্ত থাকেন, তিনি যেমন উৎসাহের সহিত জীবনের কার্যসমূহ সম্পাদন করিতে পারেন, সদা-বিরক্ত কর্কশভাব ব্যক্তি তেমন পারেন। প্রফুল্লচিত্ত ব্যক্তি যেমন স্বয়ং সর্ব্বদা সুখী থাকেন, অন্যকেও সেইরূপ সতত সুখী করেন। অন্য ব্যক্তি তাঁহাকে দেখিলেই সুখবোধ করে।

 এই অমূল্য প্রফুল্লচিত্ততা লাভ করিবার জন্য ধর্ম্মই প্রকৃষ্ট উপায়। পৃথিবীতে প্রকৃত ধার্ম্মিক ব্যক্তিই প্রফুল্লচিত্ত হইতে পারেন। প্রফুল্লচিত্ততা জীবনের পবিত্রতা ও ঈশ্বরে অটল বিশ্বাসের ফল। যিনি রিপুসকলকে বশীভূত করিয়া শান্তচিত্ত হইয়াছেন, যিনি পাপাচরণ না করিয়া শুদ্ধমনা হইয়া জীবনের কর্ত্তব্য পালন করেন, যাঁহাকে কোনরুপ কৃতকার্য্যের জন্য অনুতাপ বা ভয় করিতে হয় না, এবং যিনি ঈশ্বরের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছেন, সেই সাধুহৃদয়েই সর্ব্বদা প্রফুল্লতার হিল্লোল প্রবাহিত হইতে থাকে।


বিংশ পরিচ্ছেদ॥ মৃত্যু

 কবি মৃত্যুকে ‘শয়ন-সুন্দর’ বলিয়াছেন। ফলতঃ দুর্জ্জয় জীবনসংগ্রামে শ্রান্তমানব যখন অশ্রুপূর্ণ নয়নে, বেদনা-বিবশ হৃদয়ে ক্ষণিক বিশ্রামলাভের আকাঙক্ষা করে, তখন মত্যুই তাহার নিকট মধুর বলিয়া প্রতীয়মান হয়! কিন্তু সে তখন উপলব্ধি করিতে পারে না যে, ইহা বিশ্রাম নহে!—চিরনিদ্রা! আর যখন জীব মায়ামুক্ত হয়, তখন এই অনিত্য দেহ-পিঞ্জর আর তৃপ্তিসাধন করিতে পারে না!—সে তখন মুক্তপক্ষ বিহঙ্গমের ন্যায় ঊর্দ্ধে বিমানে উঠিতে চাহে! তখন সেই মায়ামুক্ত জীব তারস্বরে বলে,

ওহে মৃত্যু! তুমি মোরে কি দেখাও ভয়?
ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়।
সংসারের প্রেমে মন মত নয় যার
ভ্রূভঙ্গে তোমার বল কিবা ভয় তার?
যে অম্লান কুসুমের মধুপান তরে,