পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

২০

ভগবতী দেবী

সম্পূর্ণ পরিজ্ঞাত আছ, ইনি যেন ধনে বংশে শ্রীবদ্ধি লাভ করেন।” এই কথা বলিয়া ব্রাহ্মণ তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।

 আহা! সামান্য দরিদ্রের পর্ণকুটীরে যে আতিথেয়তা, উদারতা, যে সহানুভূতি ও প্রেম প্রত্যক্ষ করা যায়, তাহার তুলনা অতুল ঐশ্বর্য্যপূর্ণ রাজপ্রাসাদেও নাই! এখনও এই হতভাগ্য দেশের অতি সামান্য নিভৃত কুটীরে নীরবে প্রত্যহ যে মহান্ পবিত্র কর্ম্মের অনুষ্ঠান হইতেছে, তাহার তুলনা কোথায়? ঐশ্বর্য্যের আগার ইন্দ্রভবনতুল্য ধনীর ভোগবিলাসপূর্ণ উত্তুঙ্গ সৌধমালা দরিদ্রের শূন্য পর্ণকুটীরের বিমল পুণ্যময় জ্যোতিতে চিরনিষ্প্রভ হইয়া রহিয়াছে। দরিদ্রের পর্ণকুটীরে ঐশ্বর্য্যের কিছুই নাই সত্য, কিন্তু সেখানে হৃদয় আছে, দুঃখীর দুঃখে সহানুভূতি প্রকাশ ও দঃখ-মোচন করিবার জন্য সরল প্রাণে চেষ্টা করিবার লোক আছে। হৃদয়বান্ দরিদ্র ব্যক্তি তাঁহার জীর্ণ-পর্ণকুটীরে ক্ষণেকের মধ্যে যে মহৎ পুণ্যানুষ্ঠান করিয়া থাকেন, তাহা যে ধনীর ঐশ্বর্য্যগর্ব্বে গতি সুবৃহৎ অট্টালিকাতে নাই, কে না তাহা স্বীকার করিবেন? ভারতীয় আর্য্যপর্ণকুটীরের অতুল মাহাত্ম্যে, আমরা এখনও জীবিত রহিয়াছি।

 প্রয়াগের পর্ণকুটীরে বন্যফলমুলাশী কৌপীনধারী ভরদ্বাজ মনি স্বীয় তপঃপ্রভাবে রামমাতা কৌশল্যা, রামানুজ ভরত, শত্রুঘ্ন ও অযোধ্যাবাসিগণের সৎকারের জন্য এই মর্ত্তে যে বিপুল স্বগীয় সুখ ও ঐশ্বর্য্যের অবতারণা করিয়াছিলেন, কুরুক্ষেত্রনিবাসী উঞ্ছবৃত্তিপরায়ণ, অনশনক্লিষ্ট দরিদ্র ব্রাহ্মণের পর্ণকুটীবে সামান্য শক্তুপ্রস্থদানে যে মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান হইয়াছিল, যে পবিত্র যজ্ঞভূমিতে লুন্ঠিতকায় নকুলের অর্দ্ধাঙ্গ দিব্যকাঞ্চনময় রূপ ধারণ করিয়াছিল, যে যজ্ঞের অতুল মহিমা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞকেও নিষ্প্রভ করিয়াছিল, বজ্রনির্ঘোষে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের বিরাট সভায় নকুল যে যজ্ঞের মহিমা কীর্ত্তন করিয়া সভাস্থ সকলকে স্তম্ভিত করিয়াছিল, ভারতভাগ্যে এখনও সেই পুণ্য ও তপঃপ্রভাব বিলপ্ত হয় নাই। দরিদ্রের পর্ণকুটীর মাহাত্ম্য এখনও ভারতকে সজীব রাখিয়াছে!


তৃতীয় পরিচ্ছেদ॥ বিদ্যাসাগরের জন্ম

 যিনিই আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং যাঁহার শ্রেষ্ঠতা হেতু আমরা উপকৃত হই, তিনিই ভক্তির পাত্র। যাঁহারা সমাজের শিক্ষক, তাঁহারা ভক্তির পাত্র। যাঁহারা বিদ্যাবুদ্ধিবলে, পরিশ্রমের সহিত সমাজের শিক্ষায় নিযুক্ত, তাঁহারাই সমাজের প্রকৃত নেতা। অতএব ধর্ম্মবেত্তা, বিজ্ঞানবেত্তা, নীতিবেত্তা, দার্শনিক, পুরাণবেত্তা, সাহিত্যকার, কবি প্রভৃতির প্রতি যথোচিত ভক্তি প্রদর্শন কর্ত্তব্য। পথিবীর যাহা কিছু উন্নতি হইয়াছে, তাহা ইঁহাদের দ্বারাই সংসাধিত হইয়াছে। ইঁহারা পথিবীকে যে পথে পরিচালিত করেন, সেই পথে পৃথিবী চলে। ইঁহারা নৃপমন্ডলীরও