পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী.pdf/৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।

দশম পরিচ্ছেদ॥ সৌজন্য ও সদ্ব্যবহার

 সদসদ্-বিচারণাই নৈতিক শিক্ষার ফল। আবার এই নৈতিক শিক্ষা হইতেই বিনয়, সৌজন্য ও শিষ্টাচার প্রভৃতি সদ্‌গুণলাভ হইয়া থাকে। বিনয় ও শিষ্টাচার ব্যতিরেকে কোন শিক্ষাই সর্বাঙ্গসুন্দর হয় না। যে ব্যক্তি ব্যবহারে কথোপকথনে বিনয়, সৌজন্য ও শিষ্টাচার প্রদর্শন করিতে না পারে, এবং যে ব্যক্তি শিক্ষালাভ করিয়া সদসদবধারণে অক্ষম, সে ভদ্রসমাজে কখনই সমাদর প্রাপ্ত হয় না। তাহার জ্ঞানার্জ্জন পণ্ডশ্রম মাত্র, তাহার বিদ্যা বিড়ম্বনা ও তাহার উপাধি ব্যাধিস্বরূপ।

 যীশু খ্রীষ্ট বলিয়াছেন, “তুমি অন্যের নিকট যেরূপ ব্যবহার পাইতে ইচ্ছা কর, অন্যের প্রতিও সেইরপ ব্যবহার কর” ব্যাসদেবও বলিয়াছেন, ‘আত্মনঃ প্রতিকূলানি পরেষাং ন সমাচরেৎ।”—যাহা আপনার প্রতিকূল, তাহা অন্যের প্রতি প্রযোজ্য নহে। এই সকল মহাবাক্য সতত মনে জাগরূকে রাখা উচিত। যখন তুমি মাতাপিতার স্নেহ, আত্মীয় স্বজনের প্রীতি, কনিষ্ঠ ভ্রাতা ও ভগিনীর ভক্তি, স্বজনের প্রণয় ও অনুরাগ পাইবার বাসনা কর, তখন তাঁহাদের প্রতি যথাযোগ্য ভক্তি, প্রীতি, স্নেহ ও অনুরাগ প্রকাশ না করিবে কেন? যে অন্যকে দয়া করিতে জানে না, অপরাধীকে ক্ষমা করিতে পারে না, পরিজনগণের প্রতি প্রীতি প্রদর্শন করিতে সমর্থ হয় না, সে পরম পিতার দয়া, ক্ষমা ও স্নেহ কি প্রকারে আশা করিতে পারে?

 প্রিয় বাক্যেই জগৎ তুষ্ট হয়। যাঁহার রসনায় অমৃত আছে, সংসার তাঁহার নিকট অমৃতময়। তিনি ইহজগতে থাকিয়াও স্বর্গসুখ উপভোগ করিতে পারেন। প্রিয়বাদীর কেহ পর নহে। বিনয়, সৌজন্য ও শিষ্টাচারে পরও আপন হয়, শত্রুও মিত্র হয়। সর্ব্ববিষয়ে উদারতা প্রকাশ করা সকলেরই কর্ত্তব্য। চিত্ত উদার হইলে, বসুধাবাসি জীবগণ আত্মীয়স্থানীয় হয়। সংসারে কেহ কাহারও শত্রু বা মিত্র হইয়া জন্মগ্রহণ করে না; ব্যবহারেই শত্রু বা মিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়। যিনি সর্ব্বজীবে আত্মবৎ ভাবিতে পারেন, তিনিই সাধু; আত্মপ্রাণ যেমন অভীষ্ট, পরের প্রাণও তদ্রূপ, ইহা বিবেচনা করিয়া যিনি আত্ম তুলনায় অপরের সহিত সদ্ব্যবহার করিতে শিক্ষা করিয়াছেন, তিনিই মানবনামের যোগ্য।

 ১২৬১ সালে বা ১৮৬৮ খৃষ্টাব্দে হারিসন্ সাহেব ইনকম্ ট্যাক্সের তদন্তের জন্য কমিশনর নিযুক্ত হন। বিদ্যাসাগর মহাশয় একদিন হারিসন্ সাহেবকে বীরসিংহের বাটীতে লইয়া যাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করেন। হারিসন্ সাহেব বলেন,—“হিন্দু, প্রথানুসারে বাটীর কর্ত্তা বা কর্ত্রী নিমন্ত্রণ না করিলে, নিমত্রণ গ্রহণ করিব না।” সুতরাং হারিসন্ সাহেবের কথানুযায়ী বিদ্যাসাগরের জননী ভগবতী দেবী সাহেবকে নিমন্ত্রণ করিয়া পাঠাইলেন। সাহেব বীরসিংহ গ্রামে