বিষয়বস্তুতে চলুন

পাতা:বিদ্যাসাগর জননী ভগবতী দেবী - প্রিয়দর্শন হালদার (১৯১৩).pdf/১৮৩

উইকিসংকলন থেকে
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
জীবসেবা ও বিশ্বপ্রেম।
১৬৯

রুগ্নের শুশ্রূষায় তাঁহার আত্মপর বা ইতর ভদ্র ভেদ ছিল না। হাড়ি, ডোম, তেওর,বাগ্দী প্রভৃতি কিছুই বিচার ছিল না। কেহ পীড়িত হইয়াছে কর্ণগোচর হইলেই তাহার শয্যাপার্শ্বে তিনি সমাসীন হইতেন। তিনি কাহারও ঔষধের ব্যবস্থা করিতেছেন, কাহারও পথ্য রন্ধন করিয়া দিতেছেন, কাহারও বা অন্যবিধ শুশ্রূষা করিতেছেন, এইরূপে রুগ্নের পার্শ্বে তিনি মাতৃমূর্তিতে বিরাজমান থাকিয়া সতত তাহাদিগকে অভয় প্রদান করিতেন। কোন বালিকা বিধবা হইয়াছে বা কাহারও পুত্রবিয়োগ ঘটিয়াছে শ্রবণমাত্রই তিনি সেই শোকার্ত্ত পরিবারের মধ্যে উপস্থিত হইয়া উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিতে থাকিতেন। মধ্যে মধ্যে তিনি শোকে এতদূর অধীর হইয়া পড়িতেন যে, ধূলায় অবলুণ্ঠিত হইতে থাকিতেন। একসময়ে কোন প্রতিবেশীর একমাত্র পুত্র কঠিন পীড়াগ্রস্ত হয়। ভগবতী দেবী আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া সেই বালকের শুশ্রূষায় দিবারাত্রি অতিবাহিত করিতেন। এইরূপে একাদিক্রমে তিনি ১০।১২ দিন রাত্রি জাগরণ করিয়াছিলেন ইহাতে কিছুমাত্র তাঁহার ক্লেশানুভব হয় নাই। পরিশেষে তাঁহার ক্রোড়েই সেই বালকের মৃত্যু হয়। তখন তিনি পুত্রশোকাতুরা মাতার ন্যায় সেই মৃতদেহ বক্ষে ধারণ করিয়া উন্মত্তের হায় যেরূপ করুণ বিলাপ করিয়াছিলেন, তাহা শ্রবণ করিলে পাষাণ হৃদয়ও বিদীর্ণ হইয়া যায়। পুত্রশোকাতুরা জননীর নিকট হইতে সন্তানের মৃতদেহ গ্রহণ করা যেরূপ দুরূহ ব্যাপার, তাঁহার নিকট হইতে সেই বালকের মৃতদেহ গ্রহণ করা ততোধিক দুরূহ ব্যাপার হইয়াছিল। এরূপ দ্রবীণহৃদয়,—এরূপ সমবেদনা, এরূপ লোকসেবা—প্রকৃতপক্ষেই ইহজগতে এক বিচিত্র ব্যাপার। জীবসেবাই যেন তিনি শিবসেবা মনে করিতেন।