উৎকৃষ্ট অশন, বসন ও ভূষণে তাঁহার আদৌ স্পৃহা ছিল না। সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনেই তিনি পরিতুষ্ট হইতেন। তিনি যেন বাল্যজীবনেই উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, লালসারূপ বহ্ণিশিখা কোন ক্রমেই প্রশমিত হয় না, নির্ব্বাণ প্রাপ্ত হয় না,—উত্তরোত্তর উপচীয়মান হওয়াই ইহার ধর্ম্ম। সেই জন্য তিনি আত্মসুখ বিনিময়ে পরের সুখস্বচ্ছন্দ বিধান করিয়া সন্তোষরূপ পরমধন লাভ করিতে সতত যত্নবতী হইতেন।
বাল্যজীবনে তাঁহার আর এক বিশেষত্ব—তাঁহার দীন ভাব। অহঙ্কার যেন ক্ষণেকের তরে তাঁহার চরণ পর্য্যন্ত স্পর্শ করিতে পারে নাই। প্রত্যুতঃ দীনতা মানব-চরিত্রের অত্যুজ্জ্বল অলঙ্কার। সংসার জীবনেও ইহার অদ্ভুত প্রভাব দৃষ্ট হয়। অহঙ্কারীকে সকলেই দ্বেষ করে; দীনতা সর্ব্বত্র জয়লাভ করে। আচণ্ডাল সকলে তাঁহার দীন চরিত্রে মোহিত হয়। ধর্ম্মজগতের ত কথাই নাই। পৃথিবীতে এ পর্য্যন্ত যত ধর্ম্মমত প্রচারিত হইয়াছে, তাহার মূলে দীনতা ও তৎসহচর সৎসাহস ও ঈশ্বরনির্ভরতাই রাজত্ব করিতেছে। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ সর্ব্বভূতনিয়ামক হইয়াও যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ব্রাহ্মণের পদপ্রক্ষালনে আপনাকে নিয়োজিত করিয়াছিলেন। ভগবান্ মহম্মদ একচ্ছত্র সম্রাট হইয়াও আপনাকে কূপজলোত্তলনরূপ দাস্যকর্ম্মে নিয়োজিত করিয়া পরিবার প্রতিপালন করিয়াছিলেন। ভগবান্ বুদ্ধ মহারাজচক্রবর্ত্তী হইয়াও দীনহীন সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করিয়া জগতের পূজ্য হইয়াছিলেন। ভগবান্ শ্রীচৈতন্যদেবের দীনতা ও অভিমানশূন্যতা আজিও আবঙ্গ-উৎকলে বিঘোষিত হইতেছে।