পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/১৩৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১২০ বিভূতি-রচনাবলী o, ওদের দিকে যেন ছুটে আসচে। ঘোর শুভ্রবর্ণ মহাপ্রজলস্ত বাষ্পপরিবেশ, মাঝে মাঝে তা থেকে সহস্ৰ যোজনব্যাপী বাম্পাগ্নি বহু উধেব উঠে মহারুদ্রের মত সর্বধ্বংসকারী প্রলয়ের হুঙ্কার ছাড়চে । সে দৃত দেখে পুষ্পর চেতনা লোপ পাবার মত হোল। যতীন সেই কালাগ্লির ভৈরব দৃশ্বের দিকে পেছন ফিরে বল্পে— ভীষণ ব্যাপার, আমাদের পক্ষে এ দুষ্ঠ না দেখাই ভালো । ভয় করে প্রভু । দেবতা হেসে বল্লেন—শুধু বিশ্বদেবের মোহনমূতিই দেখবে, তার করাল, রূদ্র রূপ দেখলে ভয় পাবে কেন ? ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনি শোনাবো তোমাদের । আত্মার দুর্বলতা দূর কর । –কিন্তু আপনার শিষ্যা যে অচেতন হয়ে পড়েচে ! ও মেয়েমানুষ, ওকে ও রূপ আর নাই বা দেখালেন প্রভু ? সেই বিরাট কালাপ্লিবেষ্টিত মহাদেশ তখন ওদের অদূরে ৷ যতীনের দেখে মনে হোল একটা প্রজলন্ত বিশ্বপৃথিবী তার সামনে । অল্প পরেই দেবতার অদ্ভুত শক্তিবলে ওরা দুজনেই সেই বিরাট অগ্নিমণ্ডলের মধ্যে গিয়ে দাড়ালো। ওদের চারিধারে শুধু শুভ্র জলন্ত হিলিয়াম ও ক্যালসিয়াম বাপরাশি মহাবেগে ঘূর্ণ্যমান, কোথাও রাঙা শিখা নেই—শুধুই শ্বেতশুভ্ৰ— আবার বহুদূর অগ্নিময় দিগন্তে লক্লকে রাঙা হাইড্রোজেনশিখা অজগরের মত ফুসে গর্জে তেড়ে উঠচে চক্ষের পলকে লক্ষ লক্ষ মাইল। ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনির মত ভৈরব হুঙ্কার সে কালাগ্নিমগুলের চারিদিক থেকে একসঙ্গে অনবরত শোনা যাচ্চে । একটা গোটা ব্ৰহ্মাণ্ড যেন দাউ দাউ করে জলচে । অতি ভীষণ, রৌদ্ররূপ প্রকৃতির। ভয়ে, বিস্ময়ে যতীন আড়ষ্ট হয়ে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখলে । রৌরব নরকের বর্ণনা সে কিসে যেন পড়েছিল তার পৃথিবীর বাল্যজীবনে । এই কি সেই রৌরব নরক ? কোন দেবতার তাণ্ডবনৃত্যের পদচিহ্ন এর প্রতি অগ্নিশিখাটির গাধে জাক, উদ্ধত ও ভয়াবহ মৃত্যুদহন এর কালাগ্নিপরিবেশের প্রতি অণু প্রতি পরমাণুর মর্মস্থলে ? দূেরত বল্পেন—ভয় পেয়ো না । এই থেকেই স্থষ্টি । দাড়িয়ে দেখ । শুধু অন্ধবেগে ধাবমান অণুপরমাণুপুঞ্জের সংঘর্ষে উৎপন্ন এই বিশাল অগ্নিময় মহাদেশ যেন চারিদিক থেকে ওদের ঘিরেচে—এর শেষ কোথায় ? অতি নীলাভ শুভ্র অগ্নিগর্ভ বাষ্পপুঞ্জ, উধের নিম্নে, দক্ষিণে, বামে—ভীমবেগে সঞ্চরণশীল, আলোড়নে ও আক্ষেপে উন্মাদ সে বহ্নিমান ব্ৰহ্মাণ্ড ধরার মানুষ সহ করতে পারে না । যতীন অনুভব করলে সেও উন্মাদ হয়ে যাবে এ দৃপ্ত বেশিক্ষণ দেখলে। মনে পড়লো গ্রহদেবের মেদিনকার কথা, সেই অদ্ভুত সত্য কথা—অস্ত ব্ৰহ্মাণ্ডস্য সমস্তত: স্থিতান্বেতাদুশান্তনস্তকোটিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জলস্তি—পৃথিবীর . প্রাচীন দিনের জ্ঞানীরা যে বাণী উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন তপস্ত। দ্বার। সত্যকে অনুভব করে । হঠাৎ পথিক দেবতা যেন ভববেগে সমাধিস্থ হয়ে নিম্পদ হয়ে গেলেন ক্ষণকালের জন্যে । সুন্দর চক্ষুদুটি মুদ্রিত করে সেই অগ্নিশিখার মধ্যে তিনি স্থির প্রশাস্ত বদনে দাড়িয়ে আপন মনে অর্কুট স্বরে বলতে লাগলেন—হে অনল, হে সৰ্বেশ্বর, হে পরাবরস্বরূপ, কারণে তুমি বর্তমান, কার্যেও তুমি বর্তমান, তুমিই ধন্য—ধ্বংসের মধ্যে তোমার স্বষ্টি সার্থক হোক। জয় হোক