পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/২১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কুডুলে বিনোদপুরের বিখ্যাত বস্ত্রব্যবসায়ী রায়সাহেব ভরসারাম কুণ্ডুর একমাত্র কন্যার আজ বিবাহ । বরপক্ষের নিবাস কলকাতা, আজই বেলা তিনটের সময় মোটরে ও রিজাত বাসে কলকাতা থেকে বর ও বরযাত্রীরা এসেচে । অমন ফুল দিয়ে সাজানো মোটর গাড়ী এদেশের লোক কখনো দেখেনি । পুকুরের ধারে নহবৎ-মঞ্চে নহবৎ বসেচে, রং-বেরঙের কাপড় ও শালু দিয়ে হোগলার আসর সাজানো হয়েচে । খুব জাকের বিয়ে । রাত সাড়ে ন’টা ৷ রায়সাহেবের বাড়ীর বড় নাটমন্দিরে বরযাত্রীদের খেতে বসিয়ে দেওয়" হয়েচে । তারা সকলেই কলকাতার বাবু, কুড় লে-বিনোদপুরের মত অজ-পাড়াগায়ে যে তাদের শুভাগমন ঘটেছে, এতে রায়সাহেব রুতার্থ হয়ে গিয়েচেন, বার বার বিনীতভাবে বরযাত্রীদের সামনে এই কথাই তিনি জানাচ্ছিলেন। সভামণ্ডপ থেকে নানারকম শব্দ উত্থিত হচ্ছিল । —ও কি পালমশায়, ন-না-মাছের মুড়োটা ফেললে চলবে না— —ওরে এদিকে একবার ভাতের বালতিটা ( অর্থাৎ পোলাওএর বালতি –পোলাওকে ভাত বলাই নিয়ম, তাতে সভ্যতা, মুরুচি ও বড়মানুষী চালের বিশিষ্ট পরিচয় দেওয়া হয় ) নিয়ে আয় না-এদের পাত যে একেবারেই খালি—সন্দেশ আর দুটো নিতেই হবে-আজ্ঞে না, তা শুনবে। না—বাটাছানার না হলেও পাড়াগায়ের জিনিসটা একবার চেখে দেখুন দয়া করে— ওদিকে যখন সবাই বরযাত্রীদের নিয়ে ব্যস্ত, নাটমন্দিরের সামনের উঠানে একপাশে বিভিন্ন গ্রামের কতকগুলি সাধারণ লোক খেতে বসেচে । তাদের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণ, কিন্তু অত্যন্ত দরিদ্র—সে অন্য লোকদের সঙ্গে নিজের পার্থক্য-বজায় রেখে একটু কোণ মেরে বসেচে। বসলে কি হবে, এদের দিকে পরিবেশনের মানুষ আদৌ নেই –ফলে এর হাত তুলে খালি-পাত কোলে বসে আছে । ব্রাহ্মণযুবকের নাম যতীন। পাশের গ্রামের বেশ সৎ বংশের ছেলে । বয়েস তার পয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে। লোকটি বড়ই হতভাগ্য । বেশ স্বন্দর চেহারা, লেখাপড়া ভালই জানে, এম্-এ পর্যন্ত পড়ে গান্ধীজীর নন-কো-অপারেশনের সময় কলেজ ছেড়ে বাড়ী আছে। বিবাহ করেছিল, কয়েকটি ছেলেমেয়েও আছে, আজ কয়েক বৎসর তার স্ত্রী তার সঙ্গে ঝগড়া করে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ী গিয়ে উঠেচে। এখানে নিজেও আসে না, ছেলেমেয়েদেরও আসতে দেয় না । যতীনের বাপ-মা কেউ জীবিত নন—স্বতরাং বড় বাড়ীর মধ্যে ওকে নিতান্তই এক থাকতে হয়, তার ওপর ঘোর দারিদ্র্যের কষ্ট। একজনের খরচ, তাই চলে না। ভরসারাম কুণ্ডুর ছোটভাই ওদের পাতের সামনে দিয়ে যেতে যেতে ওকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলো—অারে এই যে যতীন, পাচ্চ-টাচ্চ তো সব ? ওরে কে আছিস এদিকে পাতে লুচি দিয়ে যা-— 豪 যতীনের মনটা খুশি হোল। এতক্ষণ সত্যিই তাদের এখানে দেখবার লোক ছিল না ।