পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবযান o তারপর দীর্ঘ তিন বছর কেটে গিয়েচে । একথা ঠিক যে, সে রকম বেদন তার মনে এখন আর নেই, থাকলে সে পাগল হয়ে যেতো । সময় তার ক্ষতে অনেকখানি প্রলেপ বুলিয়ে জালা জুড়িয়ে এনেচে। কিন্তু এমন দিন, এমন রাত্রি আসে যখন স্থতির দংশন অসহ হয়ে ওঠে। তবুও নীরবে সহ করতে হয় । তা ছাড়া আর উপায় কিছু তৈা নেই। এই ক'বছরের মানসিক যন্ত্রণায় ওর শরীর গিয়েচে, মন গিয়েচে, উৎসাহ নেই, আগ্রহ নেই, অর্থ উপার্জনের পৃহা নেই, মান-অপমান বোধ নেই। যে যা বলে বলুক, দিন কোনো রকমে কেটে গেলেই হোল। কিসে কি এসে যায় ? তেলি-তামলির বাড়ী নেমস্তন্ন খেলেই বা কি, রবাহত অনাহূত গেলেই বা কি, লোকে নিন্দে করলেই বা কি, প্রশংসা করলেই বা কি। কিছু ভাল লাগে না--কিছু ভাল লাগে না । • २ l যতীনের পৈতৃক বাড়ীট নিতান্ত ছোট নয়। পূর্বপুরুষের এক সময়ে মনের আনন্দে ঘরদোর করে গিয়েচেন। এখন এমনদাড়িয়েচে যে সেগুলো মেরামতকরবার পয়সা জোটে না। পূর্বদিকের আলসেটা কাঠালের ডাল পড়ে জখম হয়ে গিয়েচে বছর দুই হোল । মিস্ত্রী লাগানোর খরচ হাতে আসে নি বলে তেমনি অবস্থাতেই পড়ে রয়েচে । গত ত্রিশ বৎসরের কত পদচিহ্ন এই বাড়ীর উঠানে । বাবা-মা-বউদিদি...মেজদিদি--- পিসিমা-দুই ছোট ভাই--আশা খোকা-খুকৗৱা--- w কত ভালবাসতো সবাই---সব স্বপ্ন হয়ে গেল--কেউ নেই আজ--- সে শিক্ষিত বলে আগে গ্রামের লোক তাকে খুব মেনে চলতে । এখন তারা দেখেচে যে শিক্ষিত হয়েও তার এক পয়সা উপার্জন করবার শক্তি নেই, এতে এখন সবাই তাকে ঘৃণ করে। তার নামে যা-তা বলে । আশা যখন প্রথম প্রথম বাপের বাড়ী গিয়েছিল, তখন লজ্জা ও অপমান ঢাকবার জন্তে যতীন গায়ে সকলের কাছে বলে বেড়াতো—শাশুড়ী-ঠাকৃরুণের হাতে অনেক টাকা আছে— কোন দিন মরে যাবেন, বয়েস তো হয়েচে । এদিকে বড় মেয়ে প্রায়ই মার কাছে থাকে, পাছে টাকার সবটাই বেহাত হয়ে যায় তাই ও বল্লে—দ্যাখো, এই সময়টা কিছুদিন মার কাছে গিয়ে থাকি গে। নইলে কিছু পাবো না । . • এই কৈফিয়ৎ প্রথম প্রথম খুব কার্যকরী হয়েছিল বটে। তারপর বছরের পর বছর কেটে গেল, এখন লোকে নানারকম ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করে। কেউ বলে, অনেকদিন হয়ে গেল, এইবার গিয়ে বোঁকে নিয়ে এসো গে যতীন। শাশুড়ীর টাকার মায়া ছেড়ে দাও, বুড়ী সহজে মরবে না । পিছনে কেউ বলে—এই মোটর গাড়ীর শব্দ ওঠে ছাখো না! যতীনের বেী টাকার পুটুলি নিয়ে মোটর থেকে নেমে বলবে -এই নাও পাচ হাজার টাকা । তোমার টাকা তুমি রাখে । কি করবে করে—আমি খালাস হই তো আগে ! এই ধরে পুটলিটা।