পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/২৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিভূতিরচনাবলী مb তা ছাড়া আরও কত রকমের কথা বলে—সে সব এখানে ব্যক্ত করবার নয় । এই সমস্ত ব্যঙ্গ-অপমান যতীনকে বেমালুম হজম করে ফেলতে হয়। সয়ে গিয়েচে, আর লাগে না—মাঝে মাঝে কষ্ট হয় মানুষের নিষ্ঠুরতা বর্বরতা দেখে । একটা সহানুভূতির কথা কেউ বলে না, কেউ এতটুকু দরদ দেখায় না—কি মেয়ে, কি পুরুষ । সংসার যে কি ভয়ানক জায়গা, দুঃখে কষ্টে না পড়লে বোঝা যায় না। দুঃখীকে কেউ দয়া করে না, সবাই ঘৃণা করে। মানুষ হয়ে মানুষকে এত কষ্ট দিতে পারতো না যদি একটু ভেবে দেখতো। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের চিন্তার বালাই নেই তো ! এসব ভেবে কষ্ট হয় বটে, কিন্তু এসব সে গায়ে মাখে না । গা-সওয়া হয়ে গিয়েচে মামুষের নিষ্ঠুরতা, মানুষের অপমান। এর পরেও সে লোকের বাড়ীতে ভাত চেয়ে খায়। কোনদিন লোকে দেয়, কোনদিন দেয় না— বলে, বাড়ীতে অমুখ, রাধবার লোক নেই—বড়ই লজ্জিত হোলাম ভাই...ইত্যাদি । যতীনের বাড়ীর পেছনে খিড়কির বাইরে ছোট্ট একটু বাগান আছে, তাতে একটা বড় পাতিলেবুর গাছ আছে। যেদিন কোথাও কিছু না মেলে, গাছের লেবু তুলে সে বিনোদপুরের হাটে বিক্রী করতে নিয়ে যায়, আম কাঠালের সময় গাছের আম কঁঠাল মাথায় করে হাটে নিয়ে যায়। এতেও লোকে নিন্দে করে—শিক্ষিত লোক হয়ে ভদ্রসমাজের মুখ হাসাচ্চে। রায়সাহেব ভরপারাম কুণ্ডু কেন তার বাড়ীর কাজকর্মে ব্রাহ্মণদের নেমস্তন্ন করতে সাহস না করবে ? এক সময়ে বড় বই পড়তে ভালবাসতো সে । অনেক ভাল ভাল ইংরিজি বই ছিল, সংস্কৃত * বই ছিল তার ঘরে—কতক নষ্ট হয়ে গিয়েচে, কতক সে-ই বিক্রী করে ফেলেচে অভাবে পড়ে । এইসব নির্জন রাত্রে বইগুলোর জন্যে সত্যি মনে কষ্ট হয় । এইরকম নির্জন রাত্রে বহুদিন আগেকার আর একজনের কথা মনে পড়ে। সে স্বপ্ন হয়ে গিয়েচে অনেকদিন । ভুলেও তাকে গিয়েছিল, কিন্তু আশা চলে যাওয়ার পরে তার কথা ধীরে ধীরে জেগে উঠেচে । গত পাচ বছরে যতীন অনেক শিখেচে। মানুষের দুঃখ বুঝতে শিখেচে, নিজের দুঃখে উদাসীন হয়ে থাকতে শিখেচে, জীবনের বহু অনাবশ্বক উপকরণ ও আবর্জনাকে বাদ দিয়ে সহজ অনাড়ম্বর সত্যকে গ্রহণ করতে শিখেচে । বর্ষার শেষে যতীন পড়ল অমুখে। একা থাকতে হয়, এক ঘটি জল দেবার মানুষ নেই। মাথার কাছে একটা কলসী রেখে দিত-যতক্ষণ শক্তি থাকতো নিজেই জল গড়িয়ে খেত— যখন না থাকতো তয়ে চি চি করত। গায়ের লোক একেধারেই যে দেখেনি তা নয়, কিন্তু সে নিতান্ত দায়সারা গোছের দেখা । তারা দোরের কাছে দাড়িয়ে উকি মেরে দেখে যেতো— হয়তো ছেলেমেয়ের হাতে দিয়ে কচিৎ এক বাটি সাবুও পাঠিয়ে দিতো—সেও দায়সারা গোছের। সে দেওয়ার মধ্যে স্নেহ ভালবাসার স্পর্শ থাকতো না । অনেকে পরামর্শ দ্বিত—ওহে, বৌমাকে এইবার একখানা পত্র দাও । তিনি আমুন—ন