পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/৩৫০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


లి: বিভূতি-রচনাবলী আধুনিক ছিল, কিছুকাল পরে যাহাকে জীবনের জনসমুদ্রে একদম হারাইয়া ফেলি, এ সেই মেয়েটির মা । তখনকার মেয়েদের চুল বাধিবার রীতি বা কাপড়-চোপড় পরিবার ধরন একালের মত ছিল না বটে, কিন্তু সত্যিকার সুন্দরী যে হয়, তাহাকে যে-কোন সাজে, যে-কোন ঢঙে, যে-কোন ভঙ্গিতে মানায়, এবং সুলোচনা ছিল সেই ধরনের সুন্দরী মেয়ে। তাহার সেই দীর্ঘ ঋজু চম্পকগৌর যৌবনদীপ্ত দেহ, লম্বা টানা কালে কালো ডাগর চোখ, কালো কোকড়া চুলের রাশি, নিটােল মুগঠিত বাহু দুটি, মুন্দরী মুখশ্ৰী কলিকাতার পথেঘাটে গলির আড়ালে আবডালে, পথের বাকে হঠাৎ ফিরিয়াই, কিম্বা কোন নির্জন পার্কে পাদচারণরত অবস্থায় কত দিন কল্পনানেত্ৰে দেখিতাম ; দেশে ফিরিয়া কত বৰ্ষণমুখর শ্রাবণ বা ভাদ্র রজনীতে এক-ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া প্রথম-যৌবনের রঙিন নেশায় যাহার মুখ কত বার মনে পড়িত—সেই মুলোচনার কোন খবর পাই নাই আজি এত বছর, ধীরে ধীরে কবে সে বিস্মৃতির অন্ধকারে ডুবিয়া গিয়াছিল-“আবার পুরানো যুগের সেই মেয়েটি ১৯৩০ সালের কলিকাতায় কোথা হইতে ফিরিয়া আসিল । একটি প্রেমের কাহিনী। তবে সে-প্রেমের নায়ক আমি নই, গোড়াতেই কথাটা বলিয়। রাখা ভাল। সব যুগেই মেয়েরা যেমন ভালবাসে, ভালবাসিয়া কষ্ট পায়, মুখ বুজিয়া সহ করে, তিলে তিলে নিৰ্ব্বোধের মত নিজের দেহ ক্ষয় করে দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় -অত রূপ লইয়াও সুলোচনা সে-দুঃখের হাত হইতে অব্যাহতি পায় নাই জানিতাম, তাই পরবর্তী সময়ে মেয়েদের যখন ভাল করিয়া জানিয়াছিলাম ও বুঝিয়াছিলাম তখন সেকালের তরুণী প্রেমিকা সুলোচনার জন্য মাঝে মাঝে মনটা কেমন করিয়া উঠিত। যাক এখন সে-সব কথা । বৰ্ত্তমানের কথাই আবার বলি। স্বলোচনার মা অত্যন্ত বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে, আজ দেখিয়াই বুঝিলাম। কিন্তু মুলোচনার মা ভিক্ষা করিতেছে কেন ? মুলোচনা কোথায় ? কারণ ভিক্ষাই সে করিতেছিল। থামের পাশে দাড়াইয়া রাস্তার লোকের কাছে দু-একটি পয়সা চাহিতেছিল আমি লক্ষ্য করিয়াছি। আমাকে পূৰ্ব্বপরিচিত বলিয়া বুঝিতে পারিয়া বৃদ্ধ একটু সংকুচিত হইয়া পড়িল । তাহার সে-ভাবটা কাটাইয়া দিবার জন্ত বলিলাম—এখানেই কোথাও বাসা বুঝি? দোকানে জিনিস কিনতে এসেছিলেন ?—ভাল আছেন ? —আর বাবা, ভাল আর মন্দ ! তুমিও যেমন ! কথাটা ভাল লাগিল না, সুতরাং যে প্রশ্নটি এতক্ষণ করিতে বাধ-বাধ ঠেকিতেছিল, সেট করিয়া ফেললাম। ভাবিয়া দেখিলাম মুলোচনার বয়স এখন হিসাবমত প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশ —মুতরাং তাহার কথা জিজ্ঞাসা করিতে সংকোচের কারণ কি আছে ? সে এখন আর স্ত্রীড়াবনত সুন্দরী কিশোরী প্রণয়িনী নয় কারও। —ইয়ে,—গিয়ে—মু-আপনার মেয়ে কোথায় ?