পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/৩৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিধু মাষ্টার 8& সময় চরিত্রহীন, উচ্চুম্বল প্রকৃতির মেয়ে বলিয়া ভাবিয়াছি। শুধু আমি নই, আমার বন্ধুর বাসায় মেয়েরা সুলোচনা সম্বন্ধে এই মন্তব্যই হৃদয়ঙ্গম করিত । আমিও বিশ্বাস করিতাম । মনে মনে পরলোকবাসিনীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিলাম । মুলোচনার মা বলিল—মেয়ে রোজ কাদে প্রকাশ চলে যাওয়ার পরে। জানলা খুলে চেয়ে থাকে। সতীশকে দু-চোখে দেখতে পারে না। এদিকে যে বাসায় আমরা ছিলাম, তারা ঠিকমত টাকা দিতে না পারাতে আমাদের রাখতে চাইলে না। কালীঘাটে আমরা উঠে গিয়ে ছোট একটি খোলার ঘরে আশ্রম নিলাম। একদিন সেখানে এল কোথাকার রাজার ম্যানেজার—দশ হাজার টাকার লোভ দেখালে। মেয়ের গা সোনায় মুড়ে দেবে। মেয়ে বললে—ম, চুলগুলো কেটে ফেলি, নয়তো আর পারি নে। আমি বাড়ী নেই, গুণ্ডার দল বাড়ী ঘিরে ফেলেছে—বললে বিশ্বাস করবে না—এই কালীঘাটে, ইংরেজ-রাজত্বের মধ্যে! মেয়ে মাথায় কেরোসিন তেল ঢেলেছে—চুলে আগুন জেলে মরবে। এমন সময় আমি গিয়ে পড়লাম —লোক-তাকাডাকি করলাম, গুণ্ডার দল পালাল । • আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—সতীশদ যেত না বাসায় ? —যেত, টাকা দিয়ে আসত আমার হাতে মেয়েকে লুকিয়ে। মেয়েও বড্ড নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছে সতীশের সঙ্গে। একটা মুখের তাল কথাও ইদানীং বলত না। আগে আগে ওর চিঠির এক-আধখানার উত্তর দিত—শেষে তাও বন্ধ করে দিলে। আমায় বলত—ন মা ওকে আসতে দিও না । ও যে সৰ্ব্বস্বাস্ত হল আমাদের দিয়ে। কুকুরের মত আমরা ওর টাকা খাচ্ছি কেন ? ও বিয়ে-থাওয়া করবে না আমাদের না ছাড়লে । এই সময় পাড়ার এক সহৃদয় প্রৌঢ় ডাক্তার নিজে চেষ্টা করিয়া মুলোচনাকে মেডিকেল কলেজে নার্সের কাজ শিখিবার জন্ত ভৰ্ত্তি করিয়া দিলেন—পাশ করিয়া প্রথমত সেই ডাক্তারের ডাক্তারখানাতেই কাজ পায়। কিছুদিন সেখানে কাজ করিবার পরে একদিন মাকে আসিয়া বলিল—ম, এ জগতে সব সমান । ওখানে আর আমার কাজ করা চলবে না। ছেড়ে দিয়ে এলুম। মাস-দুই পরে ক্যাম্বেল হাসপাতালে কাজ জুটিল । তখন ওদের পটলডাঙায় বাসা। মা ক্যাম্বেলের গেট থেকে রোজ রাত এগারটার সময় মেয়েকে বাসায় আনে সঙ্গে করিয়া। তাহার মধ্যেও বহু বিপদ গেল। ক্যাম্বেলের নাস সুলোচনার রূপের খ্যাতি তখন চারিদিকে ছড়াইয়াছে, ছাত্রমণ্ডলীর অনেকের বাসন্তী প্রেমের-স্বপ্ন সে—কত প্রলোভন তাহকে যে প্রতিদিন এড়াইয়া চলিতে হইত। গুগুর হাতে পড়িতে পড়িতে কতদিন বাচিয়া গিয়াছে। একদিন মাকে বলিল—প্রকাশদ ফিরে এসে এ রকম দেখে খুশী হবে না। সে দেখে অসন্তুষ্ট হয় এমন কাজ কখনও করব না। তুমি আলাদা ছোট বাসা কর—আমি ক্যাম্বেলে নাসদের হোস্টেলে যাই । তাহাই হইল। হোস্টেলে দুজনের নাম দিল যারা দেখা করিতে পরিবে—স্বামীর ও প্রকাশদার—আশা ছিল প্রকাশদ একদিন হঠাৎ আসিয়া পড়িবেই।