পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/৬৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেবযান 8업 শক্ত অসুখ হয়--তারপর অমুখ সেরে গেল, কিন্তু সেই থেকে আমার কি হয়েচে আমার কথা কেউ শুনতে পায় না, লোককে ডেকে দেখেচি আমার ডাক না শুনে তারা চলে যায়। মামুদপুরের হাটে যাই, কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না । আমার শরীরে যেন থিদে তেষ্টা চলে গিয়েচে । আগে ভাত খেতাম, এখন থিদে হয় না বলে বহুকাল থাওয়: ছেড়ে দিয়েছি। শরীরটা কেমন হাল্কা মনে হয়, যেন তুলোর মত হালকী—মনে হয় যেন আকাশে উড়ে যাবে। তেষ্ট নেই শরীরে । আর একটা জিনিস বাবু, কোনে কিছুতে হাত দিলে আগের মত আর অঁাকড়ে ধরতে পারিনে। হাত গলিয়ে চলে যায়। এ কি রকম রোগ বাবুমশাই ? পুলিশের ভয়ে কোথাও যেতে পারি নে, নইলে নলদীর সরকারী ডাক্তারখানায় গিয়ে একবার ডালরবাবুকে দেখাবো ভেবেছিলাম । যতীন বল্লে—বলছি সব কথা । কিন্তু পুলিশের ভয় কর কেন ? কি করেছিলে ? বৃদ্ধ সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে বল্লে—কেন বাৰু ? —বল না । আমি কাউকে বলবে? না । আমার অবস্থা বুঝতে পারচ না ? আমিও তোমার দলের একজন । আমিও মানুষজনের সঙ্গে মিশতে পারিনে । কথাটার মধ্যে দুরকম অর্থ ছিল । বৃদ্ধ সোজাটাই বুঝলে । বুঝে বল্লে--আপনার নামেও গ্রেপ্তারী পরোয়ানা আছে নাকি বাৰু ? কি করেছিলেন আপনি ? —আমি আমার স্ত্রীকে খৈতে দিতাম না । বাপের বাড়ী ফেলে রেখেছিলাম। তার সঙ্গে আমার ঝগড়া হোত প্রায়ই । তারপর একদিন— বুদ্ধ বলে –বাবু মশাই, আপনি পুলিশের লোক । আমি বুঝতে পেরেচি। আপনি সব জানেন দেথচি। তা ধরুন আমায়, যে আমার রোগ হয়েচে, বোধ হয় বেশীদিন বাঁচবো না । এ রকম জাস্ত মরা হয়ে থাকার চেয়ে ফাসি ফুই যাবো। এতদিনে আমার ভুল বুঝতে পেরেচি বাবু মশাই । আমার বৌ-এর কোনো দোষ ছিল না, সতীলক্ষ্মী ছিল সে। আমার মনে মিথ্যে ধুক্বুক ছিল, কালাগয়লার ছোট ভাইটার সঙ্গে বড় হাসিঠাট্টা করতে। বারণও করে দেলাম অনেকবার, তাও শুনতে না । তাই একদিন রাগের মাথায়- কিন্তু দোহাই দারোগীবাবু, খুন করবো বলে মারিনি। মাঠ থেকে সবে এসে পা দিইচি বাড়ীতে, দেখি কালীগয়লার ভাই ছিচরণ খিড়কী দোর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্চে ; চাষার রাগ-বল্লাম-ও কেন বাড়ীর মধ্যে ঢুকেছিল ? বউ উত্তর দেবার আগেই রাগের মাথায় তার মাথায় এক ঘা— বৃদ্ধ হঠাৎ কেঁদে ফেললে । বল্লে—তারপর আমি সব বুঝতে পেরেছিলাম দারোগাবাৰু। ছিচরণকে বউ ভাই-এর মত দেখতো। ছিচরণ হাসির গল্প বলতে পারতো, বউ তাই শুনতে ভালবাসতো। বৌ-এর কোনে দোষ ছিল না। সেই পাপের ফলে আজ আমার এই ভয়ানক রোগ জন্মেচে শরীরে । আজ আমার জীবনের মায়া নেই, সর্বদা বউডার কথা ভাবি আজকাল । অনেক দিন থেকেই ভাবি । একা একা এই জঙ্গলে এই রোগ নিয়ে আর কাটাতে পারিনে, দারোগাবাবু। জেলে গেলে তবুও পাচটা মামুষের সঙ্গে কথা বলে বাঁচবো। দেব বল্লেন—ওকে জিজ্ঞেস কর, ও কি বৌ-এর সঙ্গে দেখা করতে চায় ?