পাতা:বিভূতি রচনাবলী (অষ্টম খণ্ড).djvu/৭২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(; 8 বিভূতি-রচনাবলী দাড়াবামাত্র তার দৃষ্টিশক্তি যেন সহস্ৰগুণে বেড়ে পেল । লক্ষ কোটি যোজন দূরবর্তী এক অতি ক্ষুদ্র গ্রহ—পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র গ্রাম ওর নয়নপথে পতিত হোল । দেখেই বুঝলে, বাংলা দেশ। সন্ধ্যা নেমে আসছে। নারিকেল সুপারি গাছে ঘেরা ছোট্ট একটা একতলা কোঠাবাড়ী । ৰাড়ীতে বিবাহ হচ্চে । উঠোনে ক্ষুদ্র শামিয়ান টাঙানো, বাইরের বৈঠকখানায় ফরাস বিছানো, বরযাত্রীরা এখনও আসে নি, কন্যাপক্ষ ব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করচে । সকলের একটা ব্যস্ততা ও উৎসাহের ভাব। কিন্তু সরুপাড় ধুতি পরনে একটি সতেরো আঠারো বছরের কিশোরী নিরানন্দ মুখে ঘরের প্রক কোণে চুপ করে বসে আছে। যেন আজকের উৎসবের সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই–মাঝে মাঝে চোখের উদগত অশ্র আঁচল দিয়ে মুছে ফেলে ভয়ে ভয়ে চকিত-দৃষ্টিতে চারিদিকে চাইচে, কেউ দেখতে না পায় । দেবী বল্লেন—ওই যে মেয়েটা দেখচে, ওর নাম সুধা, বিয়ে ওর ছোট বোনের । ওই মেয়েটার দুঃখে আমি এত কষ্ট পাচ্চি যে স্বর্গে থাকা আমার দায় হয়ে উঠেচে । ও অত্যন্ত প্রেমিকা মেয়ে—অত অল্প বয়সে অত ভাবপ্রবণ প্রেম-পাগলিনী মেয়ে বড় একটা দেখা যায় না । ও আজ বছর-দুই বিধবা হয়েচে—তেরো বছরে বিবাহ হয়েছিল । স্বামী বেঁচে ছিল বছর-দুই । এই দু-বছরে স্বামীকে ও প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিল। রোজ রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে কাদে । আজ ওর ছোট বোনের বিয়ে । ওর কেবলই মনে হচ্চে ওর বিয়ের দিনটির কথা। আজ সারাদিন লুকিয়ে কাদচে পাছে মা বাৰা মনে কষ্ট পায়। আমার আর সহ হয় না ওর দুঃখ— কি যে করি । তার চেয়েও করুণ ব্যাপার হচ্চে এই যে, মেয়েটিকে আমি তিনজন্ম ধরে লক্ষ্য করচি, তিন জন্মই ওর এই অবস্থা, বিয়ের অল্পদিন পরেই বিধবা হচ্চে । অথচ কি ভালবাসার পিপাসা ওর ! কি প্রেমপ্রবণ হৃদয় ।---আর দুেখচে তে, গরীব ঘরের মেয়ে ! পুষ্পের হৃদয় গলে গেল অভাগী বালিকার জীবনের ইতিহাস শুনে । চোখে জল এল । সে বল্লে—কিন্তু আপনার তো অসীম শক্তি, আপনি তো ইচ্ছে করলেই ওর উপায় হয় । দেবী বিষন্ন মুখে বল্লেন—ত হয় না, পুষ্প । কেন হয় না, চল তোমায় দেখাবো । তুমি আগে যাও— আমি কিছু পরেই যাবো। যতীনকে নিয়ে তুমি চলে যাও। লক্ষ লক্ষ মাইল চোখের পলকে অতিক্রম করে পুষ্প এল ওদের বুড়োশিবতলার বাড়ীতে । যতীনকে সঙ্গে নিয়ে তারপর সে চলে এল স্বধাদের বাড়ী । সুধাদের বাড়ী তখন বর এসেচে । মেয়ের হুলু দিয়ে শাক বাজিয়ে বরকে এগিয়ে নিয়ে এল । স্বধার সেখানে যাবার উপায় নেই। বাড়ীর বিধবা মেয়ে, মাঙ্গলিক কোনো অনুষ্ঠানে আজু তার সামনে থাকবার জো নেই। তবুও সে কৌতুহলদৃষ্টিতে ঘরেল জানালার গরাদে ধরে উঠোনের দিকে চেয়ে দাড়িয়ে বর দেখচে । কৌতুহল অল্পদিনের জন্য তার শোককে জয় করেচে। পুপ এসে মৃধার পাশে দাড়ালে । স্বধা যে আত্মা হিসেবে উচ্চশ্রেণীর তা তখনি বুঝলে পুপ, কারণ পুষ্পের প্রভাব সে তখনি নিজের মনের মধ্যে অনুভব করলে। তার ভারী মনট তখনি হালকা হয়ে গেল । জীবনে সব যেন শেষ হয়ে যায় নি, আরও অনেক কিছু আছে,