পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৩২৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দিবাবসান যে কটা জিনিস আমার ভাল লাগছিল তার মধ্যে প্রধান একটা হচ্ছে চারিধারের নির্জনতা— যে দিকে চাই, কোন দিকে কাউকে চোখে পড়ে না । দ্বিতীয়টি হচ্ছে, গাছপালার সমাবেশে প্রকৃতির কোন দৈন্য চোখে পড়ছিল না—বনে, ঝোপে, পাতায়, লতায়, ফুলে, ফলে, খড়ে, ঘাসে অযত্ন-সজ্জিত প্রকৃতির পরিস্ফুট বন্য সৌন্দয্য। এই আছে, তার পেছনে আরও, তার পেছনে আরও, দূরে দূরে আরও নানা রকমের বন ঝোপের সমাবেশ, ঠাসাঠাসি, অগাধ সবুজ সমূত্রে জমাট পাকিয়ে আছে। ইচ্ছামত যত খুশি দেখতে পারি, ফুরিয়ে যাবে না, মামুষের হাতে বাছাই করে পোতা দু-দশ রকমের শখের গাছ নয়। একটা উচু ঢিবির ওপরে নানাজাতীয় গাছ একসঙ্গে জড়াজড়ি করে আছে—একটা বড় সাইবাবলা গাছ, তলায় আধ-শুকনো উলু খড়, কাটাওয়ালা বৈচি গাছ, আসশেওড়া, ভাট, কচু, ওল, বিছুটি লতা— সবগুলো জড়িয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠেছে। টিবিটার ওপর উঠে নেন গাছটার ছায়ায় একটু বসলুম। এমন শান্তি অনেকদিন অনুভব করি নি—চারিদিকে চেয়ে শান্তি—কেউ কোন দিকে নেই। আর গাছগুলোর দিকে চেয়ে মহাশান্তি এই যে, সেগুলো মামুষের হাতে পোতা নয় আদেী—সম্পূর্ণ বনজ, একেবারে খাটি নিখুঁত বনজ । তলায় একেবারে শুয়ে পড়লুম। আঃ, কি আরাম! হলদে ফুলে ভরা বিছুটিলতা মাথার ওপরে দুলছে, বাতাস লেগে শুকনো সাইবাবলার পাতা ঝর-ঝর করে বুকের ওপর ঝরে পড়ছে। দুর্গা-টুনটুনি পাখী একেবারে কানের কাছে শেওড়ার ডালে বসে কুচকুচ করছে। বড় দুঃখ হল, সঙ্গে কোন বই আনি নি। প্রাণে রস যোগায় এমন বই যদি পড়তে হয় তবে এই তার স্থান । এই রকম শান্ত শীতের অপরাষ্ট্রে, এই রকম ধু-ধু মাঠের ধারের নির্জন ঝোপের মধ্যে, ডান হাতের খুটি দিয়ে মাথাটাকে উচু করে পাশ ফিরে ওয়ে, পড়তে হয় শেলির কবিতা, কি ডারউইন, কি মামুষের দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক চিস্তার ইতিহাস, কি ঐ রকম একটা কিছু। আবদ্ধ লাইব্রেরী ঘরে পুরাতন বই ও ন্যাপথলিনের গন্ধে ভারাক্রান্ত বাতাসের মধ্যে বসে বই পড়লে অতিরিক্ত পাণ্ডিত্য ও গাম্ভীর্ঘ্যের আবহাওয়ায় সন্ত পণ্ডিত হয়ে উঠেছি মনে করে পুলকিত হওয়া যায় বটে, কিন্তু এরকম নির্জন ঝোপে খোলা আকাশের তলায় বসে পড়বার ঐশ্বৰ্য্যের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। আরাম করে পড়বার এই তো জায়গা। গাছগুলোর পাতার দিকে চেয়ে যখন মনে হবে, মাঠের মধ্যের এই সামান্য শেওড়া গাছ, এই সামান্য উলুখড়টাও নয় কোটি মাইল দূরবর্তী স্বর্যের দিকে পত্র-পুপ ফিরিয়ে আছে প্রাণশক্তির ইন্ধন ভিক্ষার আশায়, ঐ বিরাট অগ্নিপিণ্ডের লক্ষ লক্ষ মাইল দীর্ঘ প্রজলন্ত হাইড্রোজেন-শিখার রক্তলীলার আড়ালে পৃথিবীর মাঠের এই সামান্ত বিছুটিলতাটিরও জীবন লুকানো রয়েছে— ডারউইনের লেখা তখন মনের মধ্যে নতুন রস যোগাবে, শেলির কবিতার নতুন অর্থ হবে। এ-রকম অবস্থায় আধ ঘণ্টার মধ্যে মনের হয়তে যে দ্বার খুলে যেতে পারে, আটার্সাটা বদ্ধ স্বরে ইলেকট্রিক পাখার তলায় আরাম-কেদারা হেলান দিয়ে পড়লে সাত বৎসরেও সে দ্বারের