পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৩৩৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


\938 বিভূতি-রচনাবলী —ঠাও মোটে লাগিও না, বিষ্টি হচ্ছে, জানালাটা বন্ধ করে দাও । আহা, এমনিতেই তো ওর কাসি হয়েছে । আরও কত কি প্রশ্ন মেয়ে দুটি করতে লাগল, আমার সব মনে রাখবার কথা নয় । আমার এটি গল্প নয় ; স্বতরাং বানানো কিছু এর মধ্যে স্থান পাবে না । এইটুকু আমার মনে আছে, ওরা দুজনে যতগুলি প্রশ্ন করলে, সবগুলি ঐ ছোট রুগণ থোকার রোগ সম্বন্ধে, পথ্য সম্বন্ধে, ওর চিকিৎসা সম্বন্ধে, ওর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা সম্বন্ধে। একবার তরুণী বধুটি করে আর একবার অন্য মেয়েটি করে। এ একবার ও আর বার। যা কিছু প্রশ্ন, সব ওই খোকাকে ঘিরে। আর ওদের চোখে—বিশেষ করে সেই তরুণী বধুটির চোখে—অদ্ভুত স্নেহবার দৃষ্টি । একবার খোকা হাচল । তরুণী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—জীব । আমার অন্যমনঙ্গতা চলে গিয়েচে ততক্ষণ । আমি বিস্মিত হয়ে উঠেছি । এমন একটা ঘটনা যেন দেখছি যা শুধু এই বিংশ শতাব্দীর নয়, সৰ্ব্বকালের, সৰ্ব্বযুগের। মানুষের প্রতি মানুষের হিংসায়, শঠতায়, নিষ্ঠুরতায়, স্বার্থপরতায়, ঈর্ষায় যে বিংশ শতাব্দীর নভোমণ্ডল আজ ধূমমলিন—যে বিংশ শতাব্দীতে আছে শুধু অর্থের আদর—সেখানে এই ময়লা-শাড়ী-পরনে দরিদ্র পল্লীবধুটি ও তার করুণাময়ী সঙ্গিনী এক নতুন বার্তা শুনিয়ে দিলে। সে বার্তা নতুন হলেও হিমালয়ের মতই পুরনো । এই গাড়ীর মধ্যে এত পুরুষ মাস্থ্য ছিল, কেউ ফিরেও চেয়ে দেখে নি ছেলেটার দিকে । সনাতনী মাতৃরূপ নারী ছটি এসে এই মাতৃহীন মৃত্যুপথযাত্রী শিশুকে মাতৃস্নেহের বহু-পুরাতন অথচ চির-নূতন বাণী শুনিয়ে দিলে : সেদিন সে ট্রেনের মধ্যে গুটি-কয়েক ক্ষণের জন্য বিংশ. শতাব্দী ছিল না—সমাজদ্রোহী, কালোবাজার-পুঞ্জ, লোভী বিংশ-শতাব্দী। ছিল সেই অমর মাতৃলোক, বিশ্বের সমগ্র জীবজগৎ যার করুণাধারায় বিধৌত । পাশকুড়া স্টেশনে বধুটি ও তার সঙ্গিনী ট্রেন থেকে নেমে গেল।