পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৩৪০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩২e বিভূতি-রচনাবলী গোটকতক গৰ্ত্ত দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই বর্ষাকালে গৰ্ত্ত যেখানে থাকে, সেখানে বিষাক্ত সপের আডড । কি করা যায় ? আমার সঙ্গী বল্পেন, আত ভয় পাবেন না। রান্না তো শেষ করি আগে । মঙ্গল টুভূ বলে একজন সাওতালের সঙ্গে কাঠের কথা বলতে সে কাঠ এনে দিতে রাজী হল । চার পয়সা মাত্র চুক্তি—আমাদের রান্নার সব কাঠ এনে দেবে। সে-ই বল্লে—কোন ঘরে রান্না করচিল তুরা ? இ —নাট মন্দিরে । —কেনে রে? ওটায় যাসনি। ঘাটোয়ালী বাংলায় যা, তোঁদের জন্যেই তো সাহেবের বাংলো খোলা থাকে। লিয়ে যাবে চল সেখানে । মঙ্গল টুডু আমাদের কাঠ ও জল এনে দিয়ে রান্নার সাহায্য করলে। ঘাটােয়ালী বাংলোয় আমরা গেলাম রান্না খাওয়ার পরে। তখন সন্দে হওয়ার পর ঘণ্টা-দুই কেটে গিয়েছিল । ঘাটোয়ালী বাংলোটি খড়ের ঘর বটে কিন্তু সিমেন্টের মেঝে, চেয়ার টেবিল খাটিয়া সব সাজানো আছে, এমন কি জানলায় দরজায় পর্দা পৰ্য্যন্ত । শিমূল শালের ঘাটোয়ালী জমিদার গবর্ণমেণ্ট বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কৰ্ম্মচারীদের বাসের জন্যে এই বাংলোঘর করে দিয়েচেন এবং তার খরচে এটার মেরামত, পরিষ্কার ইত্যাদি চালু রেখেচেন দয়া করে নয়, ঘাটোয়ালী আইন-অমুসারে বাধ্য হয়ে । আমরা গবর্ণমেণ্টের কৰ্ম্মচারী নই বটে কিন্তু বাঙালী ভদ্রলোক—মুতরাং সাত-খুন মাপ । চৌকিদার তখুনি সেলাম বাজিয়ে ঘর খুলে দিলে । এইবার সাধুজীর সঙ্গে দেখা করতে যাবার জন্তে আমরা বেঞ্চলাম। মঙ্গল টুভু আমাদের সঙ্গে ছিল, সে আমাদের জানালে, সাধু খুব বড়। মৌন থাকেন দিনে। রাত্রে কথা বলেন । সাধু দেখে বিস্মিত হলাম। প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়স হবে, আবক্ষ বিলম্বিত শ্বেত শ্মশ্র, গলায় তুলসীর মালা, হৃষ্টপুষ্ট নাদুস-মুদুস দেহ, পিতৃস্নেহভরা শান্ত বড় বড় চোখদুটি । বাঙালী সাধু, মানভূম জেলায় বাড়ী ছিল । সতেরো বছর বয়স থেকে উদাসী, গৃহত্যাগী। সব খোলাখুলি বল্লেন আমাদের কাছে। সাধুমুলভ গর্বের অস্পষ্টতা নেই তার । সাধুজ বসে ছিলেন একটা স্বপ্রাচীন বিশাল শালতার গুড়ি ঘেষে খুব বড় ও চওড়া একখানা মন্থণ শিলাখণ্ডের ওপর । শুক্লা নবমী তিথির জ্যোৎস্না ডালপালার ফঁাকে ওঁর আসনে এসে পড়েচে । কুশল পাহাড়ীর শৈলশ্রেণী ভৈরব থানকে চারিদিকে ঘিরেছে। বহু পুরাতন পাথরের চাই। সব যেন এখানে স্বপ্রাচীন—প্রাচীন সাধু, প্রাচীন শালবৃক্ষ, প্রাচীন শিলাসন, প্রাচীন অরণ্যভূমি ! মনে হল এ পরিবেশ ছেড়ে আর কোথাও যাচ্চিনে। থেকে যাই এখানেই। ঋষি, সাধু, প্রবক্তাদের জ্যোতির্বাহিনী এখানেই, এ জিনিস আর কোথাও পাবে। ন—সুন্দরগড় রাজ্যের এই স্থদুর বনভূমিতে যে বৃদ্ধ, পিতৃবং স্নেহশীল, ব্ৰহ্মজ্ঞ ঋষির পাদমূলে এসে আজ পৌঁছেচি, তিনিই মনে শান্তি এনে দেবেন। পথেঘাটে এ দুর্লভ জিনিসের সন্ধান মেলে না ।