পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৩৪৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কুশল পাহাড়ী e২৭ হওয়ায় ধানের ক্ষেত জলে ডুবু ডুবু । অনেক জায়গায় এখনো ধান বুনছে। আমন ধান এবার নাবি । খুব ভাল করেছেন কেশব । যখন কাজ থেকে অবসর নিলেন, তখন প্রভিডেন্ট ফণ্ডের দরুন ন'হাজার টাকা পেয়েই যদি তা থেকে কিছু ধানের জমি কিনতেন নিজের নামে, তবে আজ স্ত্রী আর মেয়েরা এমন হেনস্থা করতে পারতো ? স্ত্রী আর মেয়েদের দুৰ্ব্ব্যবহারের কথা মনে আসায় চোখ দিয়ে জল পড়লো, কেঁাচার খুটে মুছলেন । কি না করেছেন ওদের জন্তে । ঐ ছোট মেয়েটার নৈহাটিতে থাকতে একবার টাইফয়েড হয়েছিল, কেশব গাঙ্গুলী রাত জেগে ঘণ্টায় ঘণ্টায় থার্মোমিটার দেখেছেন, ওষুধ খাইয়েছেন, কই অবহেলা করতে পেরেছিলেন ? একশো ষাট টাকা খরচ হয়ে যায় সেই অস্বখে ••• ঐ স্ত্রী মুক্তকেশীর সেবার ইপিানির মত হল। চুচূড়ায় নিয়ে গিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে কবিরাজ দেখানো, অনুপানের ব্যবস্থা করা, পাছে আগুনের তাতে কষ্ট হয় বলে রাধতে দিতেন না, রান্নাঘরের কাছে যেতে দিতেন না। রাত্রে শুয়ে ভাবতেন, এই বয়সে ইপিানি হল, মুক্তকেশী বড় কষ্ট পাবে, কি করা যায় ? রঘুনাথপুরের পীতাম্বর দাসের কাছে ইপিানির মাদুলি পাওয়া যায়, তাই কি আনবেন ? কত ভেবেছেন। কত ব্যস্ত হয়েছিলেন। সেই মুক্তকেশী তাকে আজ বললে—বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাও, আর এসো নী— ছোট মেয়ে বললে—মরো না তুমি, মলেই বাচি। তুমি মলেই বা কি ? কেন তিনি কি ওদের জন্যে কিছু করেন নি ? চিরকাল রেলে টরে-টকা করেছেন তবে কাদের জন্তে ? খাইয়ে মাখিয়ে বড় না করলে ওরা অত বড় হল কি করে ? আজ কিনা তিনি মরে গেলে ওর বঁাচে । তিনি আজ সংসারের আপদ, এই তিয়াত্তর বছর বয়সে । এই তিয়াত্তর বছর বয়সেও গত আষাঢ় মাসে যখন কাঠের ভয়ানক অভাব হল, নিজে বঁাশঝড় খুজে খুজে শুকনো বঁাশ আর কঞ্চি কেটে গোয়ালে ডাং করেন নি, পাছে স্ত্রীর বা মেয়েদের রান্নার এতটুকু অস্থবিধে হয় সে জন্তে ? এই ভীষণ জলকাদার পথে মোট বয়ে নিয়ে যান নি ? যাক, এসব কথা তিনি বলতে, চান না । তবে মনে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, সংসার কি রকম অকৃতজ্ঞ ! যাদের জন্যে • সারাজীবন খেটে খেটে গায়ের রক্ত জল করেছেন, তারাই আজ বলে কিনা তিনি মলেই তারা বাচে, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কেশব গাঙ্গুলীর মনের মধ্যেটা হা হা করে উঠলো দুঃখে । চোখে আবার হু হু করে জল এল, ক্টোচার খুটে মুছলেন। আজ যদি– —টিকিট ? কেশব গাঙ্গলী মুখ তুলে চমকে চাইলেন। একটি ছোকর টিকেট-চেকার সামনে এলে দাড়িয়েছে। কেশব গাঙ্গুলী বললেন—রেলওয়ে সার্ভেণ্ট— ছোকরা চলে গেল ।