পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৪১৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কুশল পাহাড়ী too কি তার ভজনগানে নিষ্ঠ ! মন্দির-মাজন করতে লাগলো যেন প্রাণ ঢেলে দিয়ে । বিগ্রহের পূজোর সমস্ত আয়োজন, ফুল তোলা, পূজোর বাসন ধোয়া মাজ, ধুপধুনো দেওয়া—সব ও করবে কি একাগ্র মনে, কি ভক্তির সঙ্গে ! এখানে এসে ও ভাবতে লাগলো যেন নিজের স্থানটিতে এসে পৌছেচে এতদিনে । বাস্থদেবানন্দ সন্ধ্যাবেলা ওর মুখে হিন্দি ভজন শুনে বড় খুশি । একটি না দুটি মাত্র ভজন সে জানে, তার বাবার মুখে শোনা । তার মধ্যে একটা হল তুলসীদাসের ; “পঙ্গু চঢ়ে গিরিপর গহন মূক করে বাচাল" - বাস্থদেবানন্দ ওর পিঠ সস্নেহে চাপড়ে বলতেন—পাগলি, আর জন্মে তুই ব্রজের গোপী ছিলি । এই বয়সে এত কৃষ্ণভক্তি এল কোথা থেকে তাই ভাবি । তার ফুলের মত পবিত্র বালিকামনটি সৰ্ব্বদা উন্মুখ হয়ে থাকে এতটুকু ভক্তির আলো পাবার জন্যে । মন্দিরের বিগ্রহের অমন প্রাণঢালা সেবা দেখে স্বামীজি নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলেন । রাখনির চেহার দিনে দিনে বদলাচ্চে । সে যেন ওই মন্দিরে চিহ্নিত দেবদাসী কত কাল থেকে । রাখনি আর আমার সঙ্গে কথা বলে না। দিন দিন সে মন্দিরের কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্চে। ও দূরে সরে যাচ্চে ক্রমশই আমার কাছ থেকে । - একদিন ওকে বলি, রাখনি, আমি ভাবচি এখান থেকে চলে যাবো । ভেবেছিলুম, ও বোধ হয় বলবে, আমাকেও নিয়ে চলো । কিন্তু ও নির্বিবকার ভাবে বল্লে—কবে ? —দু একদিনের মধ্যেই । —আবার কবে আসবে ? —দেখি । এতেও ও কিছু বল্পে না। রাখনির মন অন্যদিকে চলে গিয়েচে । আমায় আর ও চায় না। বড় দুঃখ হল মনে। মনে পড়ল কুহমবতীর তীরে সেই সব সন্ধার কথা। কি মধুর হয়েই আছে সেগুলির স্মৃতি মনের কোণে। কতদূরে চলে গিয়েচে সে-সব দিন। আর কোনোদিন ফিরবে না। বেশ বুঝতে পারি আর ফিরবে না । এক এক সময় ভাবি, ভুল আমিই করেচি ৷ রাখনিকে বিয়ে করে ওদের গ্রামেই বাস করতে পারতাম। সকলেই বলেছিল, রাখনিও বলেছিল । কারো কথা শুনি নি। একদিন কাউকে কিছু না বলে কনখল থেকে রওনা হলাম। আজ সাত আট মাস হয়ে গেল, আর যাই নি, চিঠিপত্রও দিই নি । যাবোও না ! আশা করি রাখনি স্বর্থী হয়েচে । তবুও ভুলতে পারিনে কুসমাইয়ের ধারের সেই অপূৰ্ব্ব সন্ধ্যাগুলি। রাখনি আমার হাত ধরে বলেছিল, কোথায় চলে যাবে বাবুজি ? যাও তো আমায় নিয়ে যেও ।