পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৪৪৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কুশল পাহাড়ী 8३é করে গোলমাল মিটিয়ে দিতেন। পাচ গ্রামের মোড়লরা তার কাছে এসে পরামর্শ করতো, খেতে না পেলে এসে ধান নিয়ে যেতো। এমনও হয়েচে অভাবগ্ৰন্তদের ধান বিলিয়ে দিয়ে নিজের গোল শূন্ত করে ফেলেছেন হরিকাক, তখন অপরের ওপর জুলুমবাজি করে ধান নিয়ে এসেচেন, দাম দেন নি। পরের স্ত্রী বা পরের মেয়ের দিকে একবার কেউ আড়চোখে তাকিয়েচে ঘাটের পথে, কিংবা টপ্পা গানের এক কলি গেয়ে উঠেচে, অমনি সেই মেয়ের কর্তৃপক্ষের অভিযোগে সেই হতভাগ্য প্রণয়লোভী যুবককে চণ্ডীমণ্ডপের সামনের বকুলতলায় যেদিন আগাগোড়া জুতোপেটা করে ছাড়লেন—সেই দিনই হয়তো গ্রামের কুমোরপাড়ার কেষ্ট কুমোরের বিধবা মেয়ে কুলীর ঘরে তাকে মদ খেয়ে ডুগিতবলা বাজাতে শোনা গেল রাত একটা পৰ্য্যন্ত । একদিন হয়তো দেখা গেল কুলীকে নিয়ে নৌকোয় হরিকাকা হার্মোনিয়াম বাজাতে বাজাতে গান গাইতে গাইতে মহকুমা শহরের দিকে বাচ, খেলে চলেচেন—সঙ্গে অবিপ্তি বন্ধুবান্ধব দু’চারটি আছে। সেই বন্ধু আবার কেমন ? হরে মাইতি, বনোদর ঘরামির বড় ছেলে হাফেজ, রসূকে মাল, দীমু সর্দার ইত্যাদি। নবীন চকত্তি গ্রামের পুরোহিত ও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। তিনি শুনে ঘাড় নেড়ে বলতেন— না, রামপ্রাণ দাদার ছেলে। অমন নিষ্টেকাষ্ট হিন্দু এ দিগরে ছিল না । তার ছেলে কিনা মুচি মোচনমান এয়ার নিয়ে মাইফেল করে বেড়াচ্চে ! লজ্জাও করে না। এর এক হস্তা পরেই পড়লো দুর্গাপূজা। বারোয়ারী তলায় দুর্গোৎসবের ফুল বিল্বপত্র সংগ্ৰহ, নৈবেদ্য সাজানে, ভোগ রাধা, বলিদানের ব্যবস্থা, প্রসাদ বণ্টন, মায় আরতির আয়োজন, সমাগত মহিলাদের মধ্যে শেতলের ফলমূল বিতরণ প্রভৃতি সমস্ত কাজের মধ্যে রাঙা গামছা মাজায় বেঁধে ঘৰ্ম্মত্ত দেহে কে ঐ দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ, পৈতে-গলায়-মালা-করে-পরা লোকটি ছুটোছুটি করে বেড়াচ্চে সকাল থেকে রাত ন’টা পৰ্য্যন্ত ? হরিকাকা । দীননাথ মুখুজ্জের মাতৃশ্ৰাদ্ধে ঐ রাঙা গামছা মাজায় বেঁধে, ঐ পৈতে মালা করে গলায় পরে সারাদিন ব্রাহ্মণ-ভোজনের সারিতে ভীষণ খেটে পরিবেশন করচে কে ? সামান্য একটু চিনির পানা খেয়ে ?—হরিকাকা । g হরিকাকার এই অবস্থা দেখেকে বলবে ইনি কৰ্ম্মী ও ভক্ত-পুরুষ নন! মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া হরিকাকার গ+সওয়া হয়ে গিয়েছিল। যে কোনো মোকদ্দমায় যে কোনো বিষয়ে সাক্ষী দিতে ওঁর মত ওস্তাদ বড় কেউ ছিল না গ্রামে । মহকুমার কোর্টেও সবাই ওঁকে চিনতো। প্রতিপক্ষের উকিলের সাধ্য কি জেরা করে হরিকাকাকে দমিয়ে দেয়। সেই জন্যে মিথ্যে সাক্ষী দিতে সবাই ভাকে ওঁকে। সকলের কাছে খুব আদর। বেশ কিছু আয়ও হয়, আর বিষ্ণু ময়রার দোকানে গরম লুচি, তরকারী, সন্দেশ, পেট ভরে খাওয়াও চলে। সারাজীবন এইভাবে কাটিয়ে হরিকাকার এক অদ্ভুত পরিবর্তন এল আটচল্লিশ বৎসর বয়সে। সেই কথাটা বলবার জন্যেই হরিকাকার এই ইতিহাসের অবতারণা।