পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


O8 বভূতি-রচনাবলী এবারে নাচওয়ালীটি আমার কাছে এসে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গাইতে লাগলো ঃ ‘ও সই পিরিতির পসরা নিয়ে ঘুরে মরি দেশ বিদেশে’— আমারই সামনে এসে বার বার গায়, ভাবটা বোধ হয় এই, সবাই দিচ্ছে তুমি দেবে না কেন। আমার পকেটে আজকার পাওনা দশ বারোটি টাকা রয়েচে বটে, কিন্তু আমি ভাবছি, ওদের দেখাদেখি আমি যদি এই নর্তকীদের পাদপদ্মে এতগুলো টাকা বিসর্জন দিই তবে সে হবে ঘোর নির্ব,দ্ধিতার কাজ । এই সময় আমার নাকের কাছে রুমাল ঘুরিয়ে আবদুল হামিদ চৌধুরী আবার ছটাক৷ ছুড়ে ফেলে দিলে খেমটাওয়ালীর দিকে। দেখাদেখি আরও দু-তিন জন প্যাল দিলে এগিয়ে গিয়ে । এইবার সেই অল্পবয়সী নৰ্ত্তকীটি আমার কাছে এসে গান গাইতে লাগলো। বেশি বয়সের মেয়েটিই ওকে আমার সামনে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলে, সেটা আমি বুঝতে পারলাম। ও তো হার মেনে গেল, এ যদি সফল হয় কিছু আদায় করতে। আমি প্রথমটা ও মেয়েটির দিকে চেয়ে দেখি নি। এখন খুব কাছে আসতে ভাল করে চেয়ে দেখলাম যে বেশ দেখতে । রঙ ফরসা নয় বটে কিন্তু একটি অপূৰ্ব্ব কমনীয়তা ওর সারা দেহে। ভারী চমৎকার বাধুনি শরীরের। যতবার আমার কাছে এল, ওর ঢল ঢল লাবণ্যভরা মুখ ও ডাগর কালো চোখ দুটি আমার কাছে বিস্ময়ের বস্তু হয়ে উঠতে লাগলো। গলার স্বরও কি সুন্দর, অমন কণ্ঠস্বর আমি কখনো শুনি নি কোন মেয়ের। আমাদের গ্রামে শাস্তি বেশ সুন্দরী মেয়ে বলে গণ্য, কিন্তু শাস্তি এর পায়ের নখের কাছে দাড়াতে পারে না । আবার মেয়েটি ঠিক আমার সামনে এসেই গান গাইতে লাগলো। আমার দিকে চায়, আবার লজ্জায় মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে নেয়, আবার আমার দিকে চায়—সে এক অপূৰ্ব্ব ভঙ্গি। আমার মনে হোল, এখনো ব্যবসাদারি শেখেনি মেয়েটি, শুধু অন্য নর্তকীটির শিক্ষায় ও এমনি করচে। বোধ হয় তাকে ভয় করেও চলতে হয়। হঠাৎ কখন পকেটে হাত দিয়ে দুটি টাকা বার করে আমি সলজ ও স্কুণ্ঠভাবে মেয়েটির সামনে রাখলাম। মেয়েটি আমায় প্রণাম জানিয়ে টাকা দুটি তুলে নিলে । গোবিন দা ও আবদুল হামিদ চৌধুরী একসঙ্গে বলে উঠলো—বলিহারি ! আরও দুবার মেয়েটি আমার কাছে ঘুরে ঘুরে গেল। আমি দুবারই তাকে টাকা দেবার জন্যে তুলেও আবার পকেটে ফেললাম। কেমন যেন লজ্জা করতে লাগলো, দিতে পারলাম না পাছে আবদুল হামিদ কি গোবিন দা কিংবা প্রহ্নাদ সাধুর্য কিছু মনে করে। কিন্তু কি ওরা মনে করবে, কেন মনে করবে, এসব ভেবেও দেখলাম না । আবদুল হামিদ আমায় একটা সিগারেট দিলে, অন্যমনস্ক ভাবে সেটা ধরিয়ে আবার নাচের দিকে মন দিলাম ।