পাতা:বিভূতি রচনাবলী (একাদশ খণ্ড).djvu/৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


স্বখশাস্তি—তার প্রতিও আর লোভ নেই। সতীসাধ্বী স্ত্রীর সেবাযত্ব আদর ভালবাসা প্রেম যা-কিছু কাম্য সব পেয়ে, অস্তর যখন পূর্ণ, 'পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেং' কথাটা স্মরণে উদিত হওয়া মাত্র মনে হয় ঘরে যেন কি পাইনি। অবশু হাতের কাছে যদি সেই না-পাওয়া বস্তু এসে যায় ! নৃত্য, গীত, হাস্ত, লাস্ত—বারনারীর যা স্বধৰ্ম অথচ ঘরের বেী কুলবধূ যা দিতে পারে না—এই পদস্খলন তারই প্রতি আসক্তি থেকে সঞ্জাত । তাই উভয় ক্ষেত্রেই দৈহিক,মিলনের উন্মত্ত কামনাবাসনার চিত্র অপেক্ষ সেই বারনারীর ঝকৃঝকে চকৃচকে চেহারা, হাসিমুখ সাহচর্যের প্রতি আকর্ষণের চিত্র অনেক বেশী । গদাধর ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীর মনোভাব আগাগোড়া প্রকাশ পেয়েছে। ব্যবসায়ের পথেই এসেছে তার পদস্থলন। বারনারীর সঙ্গ পাবে বলেই পয়সা দিয়ে সিনেমা কোম্পানী তৈরি করেছে। সে অশিক্ষিত, গেয়ো মানুষ, পাটের আড়তদার—সে ইতিপূর্বে শহরের ওই ফিল্ম-স্টারদের চাকচিক্য কখনো চোখে দেখে নি । একেবারে সাক্ষাৎ তাদের সান্নিধ্যে এসে তাই হতচকিত। শোভারাণীকে দেখে প্রথম দিনই তার মনে হয়েছে, অনঙ্গ—তার স্ত্রী তাকে ঠকিয়েছে। মনে মনে তাকে দাড়িপাল্লায় চাপিয়ে ওজন করেছে। ব্যবসায়ীর মনোভাব জাগ্রত হয়েছে। সর্বপ্রথম এই কথাটাই তার মনে এসেছে, অথচ এতকাল সে এই স্ত্রী অনঙ্গকে নিয়ে মুখে-স্বচ্ছন্দেই সংসার করছিল। সতীসাধ্বী আদর্শ পল্লীবধু যেমন হয়, ভক্তিমতী স্বামীগতপ্রাণ গৃহকর্মনিপুণ, পূজা-আর্চ, দান-ধ্যান ও গরীব-দুঃখী সকলের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। কোন অভিযোগ ছিল না তার বিরুদ্ধে। এ তো গেল নারীর অন্তরের ঐশ্বৰ্য্যের দিক । বাইরের রূপও ছিল তার একই রকম। অধিকন্তু নারীর যে দৈহিক সম্পদ, গদাধরের স্ত্রী অনঙ্গের সেখানেও কোন দৈন্য ছিল না— “তাহার বয়স এই সাতাশ-আটাশ-প্রথম যৌবনের রূপলাবণ্য কবে ঝরিয়া গেলেও অনঙ্গ এখনও রূপসী । এখনও তাহার দিকে চাহিয়া দেখিতে ইচ্ছা করে। রং যে খুব ফসর্ণ তা নয়, উজ্জল শু্যামবর্ণ বলিলেই ভালো হয়, কিন্তু অনঙ্গর মুখের গড়নের মধ্যে এমন একটা আলগা চটক আছে, চোখ এমন টানাটনি, ভুরু ছ'টি এমন সরু ও কালো, ঠোট এমন পাতলা, বাহু দু'টির গঠন এমন নিটোল, মাথার চুলের রাশ এমন ঘন ও ঠাসবুনানো, হাসি এমন মিষ্ট যে মনে হয় সাজিয়াগুজিয়া মুখে ম্বো পাউডার মাখিয় বেড়াইলে এখনও অনঙ্গ অনেকের মৃত্যু ঘুরাইয়া দিতে পারে। নারীর আদিম শক্তি ইহার মধ্যে যেন এখনও নির্বাপিত আগ্নেয়গিরির গর্তের স্বপ্ত অগ্নির মতই বিরাজমান।” ( দম্পতি ) এ হেন স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় আসে গদাধর । স্ত্রী দেশ ছেড়ে আসতে চায় নি। কলকাতায় পাটের ব্যবসায় লাভ বেশী, ছেলের ভালভাবে লেখাপড়ার স্বষোগ পাবে, গায়ে যে তিন-চার মাস ম্যালেরিয়ায় ভুগতে হয়, তার হাত থেকেই রেহাই পাবে এই সব শুনেই রাজী হয়েছিল অনঙ্গ। গদাধর কলকাতায় একটা ছোট বাড়ি কিনে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এসে সংসার পাতে । মোট কথা এখানে আসার মুখ্য কারণ পাটের ব্যবসায়ে লাভ বেশী হওয়ার সম্ভাবনা, তা