পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১১৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১১৬ বিভূতি-রচনাবলী তুমি ছিপে ধরবে বাবা ? কত বড় বড় মাছ ? অপর বলিল—চুপ চুপ ও মাছ ধরতে দেয় না । • ফুটপাতে একজন ভিখারী বসিয়া । কাজল ভয়ের সরে বলিল—শিগগির একটা পয়সা দাও বাবা, নইলে ছয়ে দেবে ।--তাহার বিশ্বাস, কলিকাতার যেখানে যত ভিখারী বসিয়া আছে ইহাদের পয়সা দিতেই হইবে, নতুবা ইহারা আসয়া ছুইয়া দিবে, তখন তোমার বাড়ি ফিরিয়া নান করিতে হইবে সন্ধ্যাবেলা, কাপড় ছাড়িতে হইবে—সে এক মহা হাঙ্গামা । বষাকালের মাঝামাঝি অপর চাকরিটি গেল । অর্থের এমন কটে সে অনেক দিন ভোগ করে নাই । ভাল স্কুলে দিতে না পারিয়া সে ছেলেকে কপোরেশনের ফ্রি স্কুলে ভত্তি করিয়া দিল । ছেলেকে দুধ পযর্ণন্ত দিতে পারে মা, ভাল কিছু খাওয়াইতে পারে না । বইয়ের বিশেষ কিছু আয় নাই। হাত এদিকে কপদকশন । কাজলের মধ্যে অপর একটা পৃথক জগৎ দেখিতে পায় । দুটা টিনের চাকতি, গোটা দুই মাৰেবল, একটা কল-টেপা খেলনা, মোটরগাড়ি, খান দুই বই~~ইহাতে যে মানুষ কিসে এত আনন্দ পায়-আপ তাহ। ব্লঝিতে পারে না । চঞ্চল ও দুট ছেলে –পাছে হারাইয়া যায়, এই ভয়ে আপদ তাহাকে মাঝে মাঝে ধরে চাবি দিয়া রাখিয়া নিজের কাজে বাহির হইয়া যায় —এক একদিন চার পাঁচ ঘণ্টাগু হইয়া যায়—কাঞ্জলের কোনো অসুবিধা নাই--সে রাস্তার ধারের জানালাটায় দড়িাইরা পথের লোকজ্ঞান দেখিতেছে-লা হয়, বাবার বইগুলো নাড়িয়া চাড়িয়া ছবি দেখিতেছে মোটের উপর আনন্দেই আছে । এই বিরাট নগরীর জীবনস্রোত কাজলের কাছে অজানা দৰেবাধ্য। কিন্তু তাহার নবীন মন ও নবীন চক্ষ যে-সকল জিনিস দেখে ও দেখিয়া আনন্দ পায় বয়স্ক লোকের ক্লান্ত দটিতে তাহা অতি তুচ্ছ । হয়তো আঙুল দিয়। দেখাইয়া বলে- দ্যাথো বাবা, ওই চিলটা একটা কিসের ডাল মুখে ক'রে নিয়ে যাচ্ছিল, সামনের ছাদের আলসেতে লেগে ডালটা ওই দ্যাখো বাবা রাস্তায় পড়ে গিয়েচে - বাবার সঙ্গে বেড়াইতে বাহির হইয়া এত ট্রাম, মোটর, লোকজনের ভিড়ের মাঝখানে কোথায় একটা কাক ফুটপাতের ধারে ড্রেনের জলে স্নান করিতেছে তাই দেখিয়া তাহার মহা আনন্দ—তাহা আবার বাবাকে না দেখাইলে কাজলের মনে তৃপিত হইবে না। সব বিষয়েই বাবাকে আনন্দের ভাগ না দিতে পারিলে, কাঈলের আনন্দ পর্ণ হয় না। খাইতে খাইতে বেগনিটা, কি তেলে-ভাজা কচুরিখানা এক কামড় খাইয়া ভাল লাগিলে বাকী আধখানা বাবার মুখে গজিয়া দিবে - অপও তাহ খাইয়া ফেলে-ছিঃ, আমার মুখে দিতে নেই -- একথা বলিতে তার প্রাণ কেমন করে - কাজেই পিতৃত্বের গাম্ভীয"ভরা ব্যবধান অকারণে গড়িয়া উঠিয়া পিতা-পত্রের সহজ সরল মৈত্রীকে বাধাদান করে নাই, কাজল জীবনে বাবার মত সহচর পায় নাই— এবং অপরও বোধ হয় কাজলের মত বিশ্বস্ত ও একান্ত নিভরশীল তরণ বন্ধ খুব বেশী পায় নাই জীবনে i আর কি সরলতা ! পথে হয়ত দুজনে বেড়াইতে বাহির হইয়াছে, কাজল বলিল-শোনো বাবা, একটা কথা - শোনো, চুপি চুপি বলবন-পরে পথের এদিক ওদিক চাহিয়া লাজক মুখে কানে কানে বলে- ঠাকুর বড় দটোখানি ভাত দ্যায় হোটেলে—আমার খেয়ে পেট ভরে না—তুমি বলবে বাবা ? বললে আর দুটো দেবে না ? দিনকতক গলির একটা হোটেলে পিতাপত্রে দুজনে খায়—হোটেলের ঠাকুর হয়ত শহরের ছেলের হিসেবে ভাত দেয় কাজলকে –কিন্তু পাড়াগাঁয়ের ছেলে কাজল বয়সের অনুপাতে দটি বেশী ভাতই খাইয়া থাকে।