পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অপরাজিত ఏ8్స পথেঘাটে নাই, কিন্ত এতকালের পরেও বাল্যের যে ছবিগুলি একবার অঙ্কিত হইয়া গিয়াছিল তা অপরিবত্তি'তই আছে—এতকাল পরেও যদি রামায়ণ-মহাভারতের কোনও ঘটনু কল্পনা করে—নিশ্চিদিপরের সেই অস্পষ্ট, বিস্মতপ্রায় মহানগলিই তার রথীভূমি হইয়া দাঁড়ায়—অনেককাল পর সেদিন আর একবার পরনো বইয়ের দোকানে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া মাধবীকঙ্কণ ও জীবনসন্ধ্যা পড়িতেছিল—কি অদ্ভুত –পাতায় পাতায় নিশ্চিন্দিপুর মাখানো, বাল্যের ছবি এখনও সেই অস্পষ্ট-ভাবে-মনে-হওয়া জঙ্গলে-ভরা পোড়ো পুকুরটার পশ্চিম সীমানার বশিঝাড়ের তলায় 1••• এবার মাঝেমাঝে দু-একটি পন্বে"-পরিচিত বন্ধর সঙ্গে অপর দেখা হইতে লাগিল প্রায়ই। কেহ উকিল, কেহ ডাক্তার—জানকী মফঃস্বলের একটা গবৰ্ণমেণ্ট কুলের হেডমাস্টার, মন্মথ এটনির ব্যবসায়ে বেশ উপাত্তজন করে। দেবব্রত একবার ইতিমধ্যে সস্ত্রীক কলিকাতা আসিয়াছিল, স্ত্রীর পা সারিয়া গিয়াছে, দু’টি মেয়ে হইয়াছে । চাকরিতে সে বেশ নাম করিয়াছে, তবে চেষ্টায় আছে কন্ট্রাক্টারী ব্যবসায় স্বাধীনভাবে আরম্ভ করিতে ৷ দেওয়ানপরের বাল্যবন্ধ সেই সমীর আজকাল ইনসিওরেসের বড় দালাল । সে চিরকাল পয়সা চিনিত, হিসাবী ছিল—আজকাল অবস্হা ফিরাইয়া ফেলিয়াছে । কণ্টদুঃখ করিতে করিতে একবারও সে ইহাদিগকে হিংসা করে না । তারপর এবার জানুকীর সঙ্গে একদিন কলিকাতায় দেখা হইল । মোটা হইয়া গিয়াছে বেজায়, মনের তেজ নাই, গহস্থালির কথাবাৰ্ত্তা—অপর মনে হইল সে যেন একটা বন্ধ ঘরের জানালা বন্ধ করিয়া বসিয়া আছে । তাহার এটনি বন্ধ মন্মথ একদিন বলিল—ভাই, সকাল থেকে ব্রিফ নিয়ে বসি, সারাদিনের মধ্যে আর বিশ্রাম নেই—খেয়েই হাইকোট",° পাঁচটায় ফিরে একটা জমিদারী এস্টেটের ম্যানেজারী কাঁর ঘন্টা-তিনেক—তারপর বাড়ি ফিরে আবার কাজ—খবরের কাগজখানা পড়বার সময় পাই নে, কিন্তু এত টাকা রোজগার করি, তব মনে হয়, ছাত্রজীবনই ছিল ভাল । তখন কোন একটা জিনিস থেকে বেশী আনন্দ পেতুম—এখন মনে হয়, আই হ্যাভ লস্ট দি সস অফ লাইফ— অপর নিজের কথা ভাবিয়া দেখে । কৈ, এত বিরদ্ধে ঘটনার ভিতর দিয়াও তাহার মনের আনন্দ—কেন নষ্ট হয় নাই ? নট হয় তো নাই-ই, কেন তাহা দিনে দিনে এমন অদ্ভুত ধরণের উচ্ছসিত প্রাচুযে বাড়িয়া চলিয়াছে ? কেন পথিবীটা, পথিবী নয়—সারা বিবটা, সারা নাক্ষত্রিক বিশ্ববটা এক অপরুপ রঙে তাহার কাছে রঙীন ? অার দিনে দিনে এ কি গহন গভীর রহস্য তাহাকে মগধ করিয়া প্রতি বিষয়ে অতি তীব্রভাবে সচেতন করিয়া দিতেছে ?••• সে দেখিতে পায় তার ইতিহাস, তার এই মনের আনন্দের প্রগতির ইতিহাস, তার ক্রমবর্ধমান চেতনার ইতিহাস । এই জগতের পিছনে আর একটা যেন জগৎ আছে । - এই দৃশ্যমান আকাশ, পাখির ডাক, এই সমস্ত সংসার-জীবন-যাত্রা—তারই ইঙ্গিত আনে মাত্র—দর দিগন্তের বহুদ্বর ওপারে কোথায় যেন সে জগৎটা—পিয়াজের একটা খোসার মধ্যে যেমন আর একটা খোসা তার মধ্যে আর একটা খোসা, সেটাও তেমনি এই আকাশ, বাতাস, সংসারের আবরণে কোথাও যেন ঢাকা আছে, কোন জীবন-পারের মনের পারের দেশে । স্হির সন্ধ্যায় নিজনে একা কোথাও বসিয়া ভাবিলেই সেই জগৎটা একটু একটু নজরে আসে । সেই জগৎটার সঙ্গে যোগ-সেতু প্রথম স্হাপিত হয় তার বল্যে—দিদি যখন মারা যায়। তারপর অনিল—মা—অপণা—সবশেষে লীলা। দস্তর অশ্লর পারাবার সারাজীবন ধরিয়া পাড়ি দিয়া আসিয়া আজ যেন বহু দরে সে দেশের তালীবনরেখা অম্পন্ট নজরে আসে ।