পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৫১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


S88 বিভূতি-রচনাবলী বাড়িয়াছে—তাহারই একটা মাপ-কাটি আজ খুজিয়া পাইয়া দেখিয়া অবাক হইয়া গেল । চড়কতলায় পরানো আমলের কত পরিচিত বন্ধ নাই, নিবারণ গোয়ালা লাঠি খেলিত, ক্ষেত্র কাপালৗ বহরপেীর সাজ দিত, হারণ মাল বাঁশের বাঁশি বাজাইয়া বিক্রয় করিত, ইহারা কেহ আর নাই, কেবল পুরাতনের সঙ্গে একটা যোগ এখনও আছে। চিনিবাস বৈরাগী এখনও তেলে-ভাজা খাবারের দোকান করে । আজি চল্লিশ বছর আগে এই চড়কের মেলার পরদিনই তারা গ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছিল —তারপর কত ঘটনা, কত দুঃখ বিপদ, কত নতুন বন্ধবোন্ধব সব, গোটা জীবনটাই—কিস্ত কেমন করিয়া এই পরিবত্তনের মধ্য দিয়াও সেই দিনটির অনুভূতিগুলির সমতি এত সজীব, টাটকা, তাজা অবস্হায় আজ আবার ফিরিয়া আসিল । সন্ধা হইয়া গিয়াছে। চড়কের মেলা দেখিয়া হাসিমুখে ছেলেমেয়েরা ফিরিয়া যাইতেছে, কারও হাতে বাঁশের বাঁশি, কারও হাতে মাটির রং করা ছোবা পালকি ৷ একদল গেল গাঙ্গালীপাড়ার দিকে, একদল সোনাডাঙ্গা মাঠের মাটির পথ বাহিয়া, ছাতিমবনের তলায় ধলজড়ি মাধবপুরের খেয়াঘাটে—চব্বিশ বছর আগে যাহারা ছিল ছোট, এই রকম মেলা দেখিয়া ভেপ বাজাইতে বাজাইতে তেলেভাজা, জিবেগজা হাতে ফিরিয়া গিয়াছিল, তাহারা অনেকদিন বড় হইয়া নিজ নিজ কম ক্ষেত্রে ঢু কুয়া পড়িয়ছে—কেউ বা মারা গিয়াছে, আজ তাদের ছেলেমেয়েদের দল ঠিক আবার তাহাই করিতেছে, মনে মনে আজিকার এই নিপাপ, দায়িত্বহীন জীবনকোরকগলিকে সে আশীবাদ করিল। বৈশাখের প্রথমেই লীলা তার দেওরের সঙ্গে নিশ্চিন্দিপুরে আসিল । দই বোনে অনেকদিন পরে দেখা, দুই জনে গলা জড়াইয়া কাঁদিতে বসিল । অপকে লীলা বলিল— তোর মনে যে এত ছিল, তা তখন কি জানি ? তোর কল্যাণেই বাপের ভিটে আবার দেখলাম, কখনও আশা ছিল না যে আবার দেখব । খোকার জন্য কাশী হইতে একরাশ খেলনা ও খাবার আনিয়াছে, মহা খাশীর সহিত পাড়ায় পাড়ায় ঘুরিয়া সকলের সঙ্গে দেখাশুনা করিল। অপ: বৈকালে ছেলেকে লইয়া নৌকায় খাবরাপোতার ঘাট পৰ্য্যন্ত বেড়াইতে গেল। তেতুলতলার ঘাটের পাশে দক্ষিণদেশের ঝিনকতোলা বড় নৌকা বাঁধা ছিল, হাওয়ায় আলকাতরা ও গাবের রস মাখানো বড় ডিঙিগলার শৈশবের সেই অতি পুরাতন বিস্মত গন্ধ •••নদীর উত্তর পাড়ে ক্ৰমাগত নলবন, ওকড়া ও বন্যেবড়োর গাছ, ঢাল ঘাসের জমি জলের কিনারা ছুইয়া আছে, মাঝে মাঝে ঝিঙে পটলের ক্ষেতে উত্তরে মজুরেরা টোকা মাথায় নিড়ান দেয়, এক এক সহানে নদীর জল ঘন কালো, নিথর, কলার পাটির মত সমতল—যেন মনে হয়, নদী এখানে গহন, গভীর, অতলপশ",—ফুলে ভরা উলখেড়ের মাঠ, আকন্দবন, ডাঁশা খেজুরের কiিদ দলানো খেজুর গাছ, উইঢিবি, বকের দল, উচু শিমল ডালে চিলের বাসা—সবাইপরের মাঠের দিক হইতে বড় এক ঝাঁক শামকুট পাখি মধ্যখালি বিলের দিকে গেল—একটি বাবলাগাছে অজস্র বনধধল ফল দলিতে দেখিয়া খোকা আঙ্গল দিয়া দেখাইয়া বলিল—ওই দেখ বাবা, ওই যে কলকাতায় আমাদের গলির মোড়ে বিক্ৰী হয় গায়ে সাবান মাখবার জন্যে, কত ঝুলচে দেখ, ও কি ফল বাবা ? অপর কিস্ত নিবাক হইয়া বসিয়া ছিল । কতকাল সে এ সব দেখে নাই !-পথিবীর এই মুক্ত রপে তাহাকে যে আনন্দ দেয়, সে আনন্দ উগ্রবীয্য সরার মত নেশার ঘোর আনে তাহার শিরায় রক্তে, তাহা অভিভূত করিয়া ফেলে, আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, তাহা অবর্ণনীয়। ইহাদের যে গোপন বাণী শধে তাহারই মনের কানে কানে, মাথে তাহা বলিয়া বঝাইবে সে কাহাকে ?