পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ృ&0 বিভূতি-রচনাবলী করিয়া হাতে মাথা রাখিয়া শ্যইয়া থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কিছই করে না, রৌদ্রভরা নীল অ্যকাশটার দিকে চাহিয়া শধে চুপ করিয়া থাকে—কিছ ভাবেও না-সবুজ ঘাসের মধ্যে মাখ ডুবাইয়া মনে মনে বলে—ওগো মাতৃভূমি, তুমি ছেলেবেলায় যে অমতদানে মুনিষ করেছিলে, সেই অমত হ’ল আমার জীবন-পথের পাথেয়—তোমার বনের ছায়ায় আমার সকল স্বপ্ন জন্ম নিয়েছিল একদিন, তুমি আবার শক্তি দাও, হে শক্তিরাপিনী ! দুঃখ হয় কলিকাতার ছাত্রটির জন্য । এদের বাপের বাড়ি বৌবাজারে, মামার বাড়ি পটুয়াটোলায়, পিসির বাড়ি বাগবাজারে—বাংলাদেশকে দেখিল না কখনও । এরা কি মাধবপুর গ্রামের উলখেড়ের মাঠের ও-পারের আকাশে রং-ধরা দেখিল ? স্তবধ শরৎ-দপুরের ঘন বনানীর মধ্যে ঘুঘরে ডাক শুনিয়াছে ? বন-অপরাজিতা ফুলের নীরব মহোৎসব এদের শিশু-আত্মায় তার আনন্দের সপশ’ দিয়াছে কোনও কালে ? ছোট মাটির ঘরের দাওয়ায় আসনপি’ড়ি হইয়া বসিয়া নারিকেল-পত্রশাখায় জ্যোৎস্নার কপিন দেখে নাই কখনও—এরা অতি হতভাগ্য । রানীর যত্বে আদরে সে মগধ হইয়া গেল । সতুদের বাড়ির সে-ই আজকাল করী, নিজের ছেলেমেয়ে হয় নাই, ভাইপোদের মানুষ করে । অপকে রানী বাড়িতে আনিয়া রাখিল— কাজলকে দু’দিনে এমন আপন করিয়া লইয়া ফেলিয়াছে যে, সে পিসিমা বলিতে অজ্ঞান। রানীর মনে মনে ধারণা, অপর শহরে থাকে যখন, তখন খুব চায়ের ভক্ত,—দুটি বেলা ঠিক সময়ে চা দিবার জন্য তাহার প্রাণপণ চেণ্টা। চায়ের কোন সরঞ্জাম ছিল না, লুকাইয়া নিজের পয়সায় সতুকে দিয়া নবাবগঞ্জের বাজার হইতে চায়ের ডিস পেয়ালা আনাইয়া লইয়াছে—অপর চা তেমন খায় না কখনও, কিন্তু এখানে সে সেকথা বলে না। ভাবে—যত্ব করচে রাণ দি, করক না । এমন যত্ব আর জুটবে কোথাও? তুমিও যেমন ! দপরে একদিন খাইতে বসিয়া অপম চুপ করিয়া চোখ বজিয়া বসিয়া আছে। রানীর দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিল—একটা বড় চমৎকার ব্যাপার হ’ল-দেখো, এই টকে-যাওয়া এ’চড়-চচ্চড়ি কতকাল খাই নি—নিশ্চিশিদপুর ছেড়ে আর কখনও নয়- তাই মুখে দিয়েই ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল রাণাদি— রাণাদি বোঝে এসব কথা—তাই রাণাদির কাছে বলিয়াও সুখ । এ কয়দিন আকাশটা ছিল মেঘ-মেঘ। কিন্তু হঠাৎ কথন মেঘ কাটিয়া গিয়াছে সে জানে না—বৈকালে ঘুম ভাঙিয়া উঠিয়া সে অবাক চোখে চুপ করিয়া বাহিরের রোয়াকে বসিয়া রহিল—বাল্যের সেই অপৰব বৈকাল—যাহার জন্য প্রথম প্রথম বিরহী বালক-মন কত হাঁপাইয়াছে বিদেশে, ক্ৰমে একটা অস্পষ্ট মধরে মতিমাত্র মনে অকিয়া রাখিয়া সেটা কবে মন হইতে বেমালাম অন্তহিত হইয়া গিয়াছিল— মনে পড়ে ছেলেবেলায় এই সব সময়ে ঘুম ভাঙিয়া তাহার মনটা কেমন অকারণে খারাপ হইত—এক একদিন কেমন কান্না আসিত, বিছানায় বসিয়া ফু’পাইয়া ফু’পাইয়া কাঁদিত— তাহার মা ঘাট হইতে আসিয়া বলিত—ও-ওই উড়ে গেল—ও-ও-ওই “কেদো না খোকা, বাইরে এসে পাখি দেখসে । আহা হা, তোমার বড় দখখ খোকন—তোমার নাতি মরেছে, পতি মরেছে, সাত ডিঙে ধন সমন্দিরে ডুবে গিয়েছে, তোমার বড় দখখ—কেদো না কে"দো না, আহা হা !••• রানী পাতকুয়া হইতে জল তুলিয়া লইয়া যাইতেছে, অপ বলিল—মনে পড়ে রাণাদি, এই উঠোনে এমন সব বিকেলে বৌ-চুরি খেলা খেলতুম কত, তুমি, আমি, দিদি, সতু, নেড়া—? রাণ বলিল—আহা, তাই বঝি ভাবচিস বসে বসে ! কত মালা গাঁথতুম মনে আছে