পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ఏరీక్షి বিভূতি-রচনাবলী মাখাইয়া দেয়, সেদিনের বৈকাল। এমন বিবেকুলের অপর্বে সরভি-মাখানো, এমন পাখিডাকা উদাস বৈকাল—কোথায় এর তুলনা ? এত বেলগাছও কি এ দেশটায়, ঘাটে, পথে, এ-পাড়া, ও-পাড়া সম্ভবত বিবেকুলের সুগন্ধ । একদিন—জ্যৈষ্ঠের প্রথমটা, বৈকালে আকাশ অন্ধকার করিয়া ঈশান কোণ হইতে কালবৈশাখীর মেঘ উঠিল, তার পরেই খব ঝড়, এ বছরের প্রথম কালবৈশাখী । অপর আকাশের দিকে চাহিয়া চাহিয়া দেখিল—তাদের পোড়োভিটার বশিবনের মাথার উপরকার দশ্যটা কি সপরিচিত ! বাল্যে এই মাথাদলানো বাঁশঝাড়ের উপরকারের নীলকৃষ্ণ মেঘসম্প্রজা মনে কেমন সব অনতিপল্ট আশা-আকাংক্ষা জাগাইত, কত কথা যেন বলিতে চাহিত, আজও সেই মেঘ, সেই বাঁশবন, সেই বৈকাল সবই আছে, কিন্তু সে অপব জগৎটা আর নাই । এখন যা আনন্দ সে শধ্যে পাতির আনন্দ মাত্র। এবার নিশ্চিন্দিপুর ফিরিয়া অবধি সে ইহা লক্ষ্য করিতেছে —এই বন, এই দপুর, এই গভীর রাত্রে চৌকিদারের হাকুনি, কি লক্ষীপেচার ডাকের সঙ্গে এক অপদ্রব সর্বপ্ন মাখানো ছিল, দিগন্তরেখার ওপারের এক রহস্যময় কপেলোক তখন সদাসন্ধব"দা হাতছানি দিয়া আহবান করিত—তাদের সন্ধান আর মেলে না । সে পাখির দল মরিয়া গিয়াছে, তেমন দােপর আর হয় না ; যে চাঁদ এমন বৈশাখীরাত্রে খড়ের ঘরের দাওয়ার ধারের নুরিকেল-পত্রশাখায়জ্যোৎস্নার কােপন আনিয়া এক ক্ষুদ্র কল্পনাপ্রবণ গ্রাম্য বালকের মনে মতুল্যহীন, কারণহীন আনন্দের বান ডাকাইত, সে সব চাঁদ নিভিয়া গিয়াছে। সে বালকটিই বা কোথায় ? পাচশ বৎসর আগেকার এক দপুরে বাপমায়ের সঙ্গে দেশ ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছিল, আর ফেরে নাই, জাওয়া-বাঁশের বনের পথে তার ছোট ছোট পায়ের দাগ অপস্ট হইয়া মছিয়া গিয়াছে বহুদিন । তার ও তার দিদির সে সব আশা পণ্যে হইয়াছিল কি ? হায় অবোধ বালক-বালিকা ! রোজ রোজ বৈকালে মেঘ হয়, ঝড় ওঠে। অপর বলে—রাণ দি, আম কুড়িয়ে আনি ? রানী হাসে । অপর ছেলেকে লইয়া নতুন-কেনা বাগানে আসিয়া দাঁড়ায়—সবাইকে আম কড়াইতে ডাকে, কাহাকেও বাধা দেয় না। বাল্যের সেই পটুলে, তেতুলতলী, নেকো, বাঁশতলা,—ঘন মেঘের ছায়ায় জেলেপাড়ার তো আবালবদ্ধবনিতা ধামা হাতে আম কড়াইতে আসে। অপর ভাবে, আহা, জীবনে এই এদের কত আনন্দের কত সার্থকতার জিনিস । চারিধারে চাহিয়া দেখে, সমস্ত বাগানের তলাটা ধাবমান, কৌতুকপর, চীৎকাররত বালকবালিকাতে ভরিয়া গিয়াছে ! দিদি দরগা, ছোট্ট মেয়েটি, এই কাজলের চেয়ে কিছবড়, পরের বাগানে আম কড়াইবার অপরাধে বকনি-খাওয়া কৃত্রিম উল্লাসভরা হাসিমুখে একদিন ওই ফণিমনসার ঝোপের পাশের বেড়াটা গলিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল—বহনকালের কথাটা । অপু কি করিবে আমবাগানে ? এই সব গরীব ঘরের ছেলেমেয়েরা সাধ মিটাইয়া আম কড়াইবে এ বাগানে, কেহ তাহাদের বারণ করিবার থাকিবে না, বকিবার থাকিবে না, অপমান করিবার থাকিবে না, ফণিমনসার ঝোপের আড়ালে অপমানিতা ছোট খকৌটি ধলামাথা আচল গছাইয়া লইয়া ফিরিয়া দাঁড়াইয়া মদ মদ তৃপ্তির হাসি হাসিবে••• এত দিন সে এখানে আসিলেও নিজেদের ভিটাটাতে ঢুকিতে পারে নাই, যদিও বাহির হইতে সেটা প্রতিদিনই দেখিত ; কারণ ঘাটের পথটা তার পাশ দিয়াই । বৈকালের দিকে সে একদিন একা চুপি চুপি বনজঙ্গল ঠেলিয়া সেখানে ঢুকিল । বাড়িটা আর নাই, পড়িয়া ইট স্তপোকার হইয়া আছে—লতাপাতা, শ্যাওড়াবন, বনচালতার গাছ, ছেলেবেলাকার মত কালমেঘের জঙ্গল। পিছনের বাঁশঝাড়গলা এই দীঘ সময়ের মধ্যে বাড়িয়া চারিধারে