পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


Տ6:Տ বিভূতি-রচনাবলী বাড়িয়া বড়ো হইয়া গিয়াছে—ফল খাইতে আর কেহ আসে নাই—জঙ্গলে ঢাকিয়া পড়িয়া আছে এতকাল—অপরাহের রাঙা রোদ গাছটার গায়ে পড়িয়া কি উদাস, বিষাদমাখা দশ্যটা ফুটাইয়াছে যে ! ছায়া ঘন হইয়া আছে, কাঁচাকলায়ের ডালের মত সেই লতাটার গন্ধ আরও ঘন হয়—অপর শরীর যেন শিহরিয়া ওঠে—এ গন্ধ তো শুধ গন্ধ নয়—এই অপরাহ্লে, এই গন্ধের সঙ্গে জড়ানো আছে মায়ের কত রাত্রের আদরের ডাক, দিদির কত কথা, বাবার পদাবলী গানের সর, বাল্যের ঘরকন্নার সন্ধাময় দারিদ্র্য—কত কি—কত কি— ঘন বনে ঘঘে ডাকে, ঘাঘ-ঘ— সে অবাক চোখে রাঙ্গারোদ-মাখানো সজনে গাছটার দিকে আবার চায়--- মনে হয় এ বন, এ স্তপোকার ইটের রাশি, এ সব স্বপ্ন—এখনি মা ঘাট হইতে সন্ধ্যায় গা ধইয়া ফিরিয়া ফরসা কাপড় পরিয়া ভিজা কাপড়খানা উঠানের বাঁশের আলনায় মেলিয়া দিবে, তারপর প্রদীপ হাতে সন্ধ্যা দিতে দিতে তাহাকে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইয়া বিন্মিত অন্যযোগের সরে বলিয়া উঠিবে—এত সন্ধ্যে করে বাড়ি ফিরাল অপ : ভিটার চারিদিকে খোলামকুচি, ভাঙা কলসী, কত কি ছড়ানো—ঠাকুরমায়ের পোড়োভিটাতে তো পা রাখিবার স্থান নাই, বটির ধোয়াতে কতদিনের ভাঙা খাপরা খোলামক চি বাহির হইয়াছে । এগুলি অপরকে বড় মগধ করিল, সে হাতে করিয়া তুলিয়া দেখিতে লাগিল । কতদিনের গহস্থ-জীবনের সুখ-দুঃখ এগলার সঙ্গে জড়ানো ! মা পিছনের বাঁশবনে এক জায়গায় সংসারের হাঁড়িকড়ি ফেলিত, সেগুলি এখনও সেইখানেই আছে ! একটা আসেক-পিঠে গড়িবার মাটির মচি এখনও অভগ্ন অবস্হায় আছে । অপর অবাক হইয়া ভাবে, কোন আনন্দভরা শৈশবসন্ধ্যার সঙ্গে ওর সম্বন্ধ ছিল না জানি ! উঠানের মাটির খোলামক চির মধ্যে সবুজ কাচের চুড়ির একটা টুকরা পাওয়া গেল । হয়ত তার দিদির হাতের চুড়ির টুকরা —এ ধরনের চুড়ি ছোট মেয়েরাই পরে—টুকরাটা সে হাতে তুলিয়া লইল । এক জায়গায় আধখানা বোতল-ভাঙা—ছেলেবেলায় এ ধরনের বোতলে মা নারিকেল তৈল রাখিত—হয়ত সেটাই । একটা দশ্য তাকে বড় মগধ করিল। তাদের রান্নাঘরের ভিটার ঠিক যে কোণে মা রধিবার হাঁড়িকড়ি রাখিত—সেখানে একখানা কড়া এখনও বসানো আছে, মরিচা ধরিয়া বিকৃত হইয়া গিয়াছে, আটা খসিয়া গিয়াছে, কিন্ত মাটিতে বসিয়া যাওয়ার দরন একটুও নড়ে नां । * তাহারা যেদিন রান্না-খাওয়া সারিয়া এ গী ছাড়িয়া রওনা হইয়াছিল—আজ চবিশ বৎসর পদেব", মা এটো কড়াখানাকে ওইখানেই বসাইয়া রখিয়া চলিয়া গিয়াছিল—কে কোথায় লপ্ত হইয়া গিয়াছে, কিন্তু ওখানা ঠিক আছে এখনও । • কত কথা মনে ওঠে । একজন মানুষের অন্তরতম অস্তরের কাহিনী কি অন্যমান ধবোঝে । বাহিরের মানুষের কাছে একটা জঙ্গলে-ভরা পোড়োভিটা মাত্র—মশার ডিপো । তুচ্ছ জিনিস । কে বুঝিবে চব্বিশ বৎসর পর্বের এক দরিদ্রঘরের অবোধ বালকের জীবনের আনন্দমহমত্তগুলির সহিত এ জায়গার কত যোগ ছিল ? ত্রিশ, পঞ্চাশ, একশো, হাজার, তিন হাজার বন্ধুর কাটিয়া যাইবে—তখন এ গ্রাম লুপ্ত হইবে, ইছামতীই চলিয়া যাইবে, সম্পণে নতুন ধরনের সভ্যতা, নতুন ধরণের রাজনৈতিক অবস্হা —যাদের বিষয় এখন কল্পনা করিতেও কেহ সাহস করে না, তখন আসিবে জগতে ! ইংরেজ জাতির কথা প্রাচীন ইতিহাসের বিষয়ীভূত হইয়া দাঁড়াইবে, বৰ্ত্তমান বাংলা ভাষাকে তখনও হয়ত আর কেহ বুঝিবে না, একেবারে লুপ্ত হইয়া গিয়া সম্পণ অন্য ধরণের ভাষা এদেশে প্রচলিত হইবে । তখনও এই রকম বৈকাল, এই রকম কালবৈশাখী নামিবে তিন হাজার বয় পরের বৈশাখ