পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/১৯১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১৮8 * বিভূতি-রচনাবলী ঘরে ? সামনে এসো না দেখি ? ওর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন পাশের কুঠুরির ওদিকের কবাটবিহীন দোর দিয়ে দ্রতপদে বেরিয়ে গেল—বাইরের চাতালে তার পায়ের শব্দ বেশ পন্ট শোনা গেল, শরং মন্দিরের মেঝেতে মাটির পিলসজে বসানো প্রদীপটা জালাতে জালাতে আপন মনে বকতে লাগল—দোগেছের মশান তোমাদের ভুলে রয়েছে ? মনুখপোড়া বাঁদরের দল— বাড়িতে মা-বোন নেই ? ওর আগের ভয়টা একেবারে সম্পণে কেটেছে । ব্যাপারটা অপ্রাকৃতের শ্রেণী থেকে সম্পণে বাস্তবের গণিডর মধ্যে এসে পৌচেছে । দ-পাঁচ মাস অন্তর, কখনো বা উপরি উপরি দু-তিন মাস ধরে—এক-একদিন এরকম কান্ড উত্তর দেউলে সন্ধ্যাবেলা আলো দিতে এসে ঘটেই থাকে। গ্রামের বদমাইশ কোনো ছেলে-ছোকরার কান্ড। এমন কি, কার কান্ড শরৎ খানিকটা মনে মনে সন্দেহও করতে পারে—তবে সেটা অবিশ্যি সন্দেহ মাত্রই ৷ শরৎ এসবে ভয় খায় না, ভয় খেতে গেলে তার চলেও না । দরিদ্রের ঘরে সুন্দরী হয়ে যখন জন্মেছে, তখন এ রকম অনেক উপদ্রব সহ্য করতে হবে, সে জানে । বাবার তো সে-সব জ্ঞান নেই, সেই যে বেরিয়েছেন কখন তিনি ফিরবেন তার ঠিকানা আছে ? একাই এই নিবান্দা পরীর মধ্যে যখন থাকা, তখন ভয় করে কি হবে ? আসকে না কার কত সাহস, ব’টি নেই ঘরে ? ব"টি দিয়ে নাক যদি কেটে দখোনা না করে দিই তবে আমি গড়শিবপুরের রাজবংশের মেয়ে নই! পাঞ্জি, বদমাইশ সব কোথাকার । প্রদীপ দেখিয়ে যখন সে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়ালে—তখন সম্পধ্যার অন্ধকার বেশ ভাল করে নেমেছে । ওই দীঘির পাড়ের ছাতিমবনটা বড় অন্ধকার হয়ে পড়ে এ সময়— ওখানটাতে ভয় যে না করে এমন নয়। শরৎ যে-প্রদীপটা হাতে করে এনেছিল, সেই প্রদীপটা প্রাণপণে অচিল দিয়ে বাঁচিয়ে বাদােড়নখীর কাঁটাজঙ্গলের পথ বেয়ে চলে গেল—শুকনো ফলের থোলো নাড়া পেয়ে ঝমােঝম করছে—দ-একবার ওর কাপড় পেছন থেকে টেনেও ধরলে বাদড়নখী ফলের বাঁকা ঠোট—দ-একবার ও ছাড়িয়েও নিলে । বাড়ি পৌঁছে যদি রাজলক্ষীকে দেখতে পেতো, খুব খুশী হ'ত সে, কিন্ত সে পোড়ারমুখী আসে নি। শরৎ রান্নাঘরে ঢুকে উন্ন জেলে রান্না চড়িয়ে দিলে । গোপেশ্বর চাটুজে ছিল এতদিন, শরতের বেশ লাগতো । বাপের বয়সী বন্ধকে সেবা করে আনন্দ পেতো সে—কেদার সে-রকম নন, তিনি সেবা তেমন কখনও চান না। তা ছাড়া নিৎজ’ন পরীতে দু-একজন মানযের মুখ যদি দেখা যায়, সে ভালই । শরৎ সেবা করতে ভালবাসে, পছন্দ করে । জীবনে যেটা সে চেয়েছিল, তাই তার হ’ল না । স্বামীর কথা তার ভাল মনে হয় না, সেদিক থেকে আর মন শান্য—সে মন্দিরের সোপান-বেদীতে কোনো দেবতা নেই—তাদের গড়ের উত্তর দেউলের মতই। সেজন্যে শরৎ স্বাধীন আছে এখনও– সম্পণে স্বাধীন। মনের দিগন্তে এতটুকু মেঘ নেই কোনোদিকে । বেশী রাত এখনও হয় নি, শরৎ ডাল সবে নামিয়েছে—এমন সময় কেদার বাড়ি এলেন । শরৎ হাসিমুখে বললে, এত সকালে যে বাড়ি ফিরলে ? আবার যাবে বুঝি ? কেদার শাস্তভাবে বললেন, না আর যাবো না—তবে— —না বাবা, আজ আর যেও না— কেদার একটু অবাক হয়ে মেয়ের মাখের দিকে চাইলেন। ওর গলার সরের মধ্যে বোধ হয় কি পেলেন । - —কেন বলো তো মা ?