পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২০৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কেদার রাজা Հօo সময় ভাঙা দেউড়ির রাস্তায় প্রভাসকে আসতে দেখে হঠাৎ বড় ব্যস্ত হয়ে উঠলেন । —আরে, এসো এসো বাবাজি এসো ! কি মনে করে ?--- প্রভাস একা এসেছে। ওবেলার সাজ আর এবেলা নেই গায়ে—সাদা সিকের একটা শার্ট পরেছে, হাতে ও গলায় সোনার বোতাম, পরনে জরিপাড় ধতি, পায়ে নতুন ফ্যাশনের খাঁজকাটা জুতো । হাতের পাঁচ আঙ্গলের মধ্যে তিন আঙ্গলে পাথর-বসানো আংটি রোদ পড়ে চিকচিক করছে । —ও শরৎ, মা এদিকে এসো—প্রভাসকে একটা- বসার জায়গা দাও । চা খাবে তো প্রভাস ? হ’্যা, খাবে বৈকি, বোসো বোসো । প্রভাস বললে, আপনাদের এখানে মোটর আসবার রাস্তা নেই। গাড়িখানা গড়ের খালের ওপারে দাঁড় করিয়ে রেখেছি। শরৎ একটা আসন বার করে প্রভাসকে বসতে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে সভবতঃ চা করতে গেল। প্রভাস বসে চারিদিকে তাকিয়ে বললে, আমি এর আগে কখনো গড়বাড়িতে আসি নি, খুব কাল্ড ছিল তো এক সময় ! দেখে শুনে সত্যিই অবাক হয়ে যাবার কথা বটে। কি ছিল, তাই ভাবি ! মন কেমন যেন হয়ে যায়। না, কাক ?” কেদার এ ধরণের কথা অনেক লোকের মুখ থেকে অনেক ঝর শুনেছেন, শুনে আসছেন তাঁর বাল্যকাল থেকে । এই সব ইট-পাথরের ঢিবি আর জঙ্গলের মধ্যে লোকে কি যে দেখতে পায়, তিনি ভেবেই পান না । পয়সা থাকলেই বোধ হয় মানষের মনে এ-সব অদ্ভুত ও আজগুবী মনোবাত্তির সন্টি হয়—কে জানে ? কেদারের কৌতুক হয় এ ধরণের কথা শনেলে । থাকে সব কলকাতায় বড় বড় বাড়িতে, ইলেকটির আলো আর পাখার তলায়, এই সব পাড়াগাঁয়ে এসে যা দেখে তাই ভাল লাগে—আসল কথাটা হ’ল এই ৷ একবার অনেক দিন আগে মহকুমার হাকিম এসেছিলেন এই গ্রামে কি একটা মোকদ্দমার তদারক করতে। যেমন সকলেই আসে, তিনি এলেন গড়শিবপুরের রাজবাড়ি দেখতে । কেদারের ডাক পড়ল। কেদার তো সকোচে জড়সড় হয়ে হাকিমের সামনে হাজির হলেন । হাকিমহকুমকে বিশ্বাস নেই, কাঁচা-খেকো দেবতা সব। হাকিম জিজ্ঞেস করলেন, আপনি গড়শিবপুরের রাজবংশের লোক ? —আজ্ঞে, হজের l • —আপনাকে দেখে আমার মনের মধ্যে কি হচ্ছে জানেন ? আপনি কে আর আমি কে ! আপনি এ পরগনার রাজা—আর আমি—আপনার একজন কমচারীর সমান । কেদার সম্প্ৰম দেখিয়ে নীরব রইলেন। বড়লোক খেয়াল-খাঁশিতে অনেক কিছর বলে— সব কথার জবাব দিতে নেই ৷ ” শরৎ তখন মাত্র পনেরো বছরের মেয়ে, উভিন্ন-ষৌবনা, অপব্ব সন্দেরী । হাকিম তাকে কাছে ডেকে আদর করে বললেন, মাকে আমি নিয়ে যেতাম, যদি আজ রাঢ়ী শ্রেণীর ব্রাহ্মণ হতাম, আমার সে সৌভাগ্য নেই। আমার ছেলেটি এবার বি-এ পাশ করেছে। কিস্ত বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণের সঙ্গে তো আপনি কাজ করবেন না। মা আমার রাজবংশের মেয়ে বটে। ওর সেবা পাবো, সে ভাগ্য কি আর করেছি ? শরৎ মুখ নীচু করে রইল লৎজায় ও সঙ্কোচে । দশ-এগারো বছর আগেকার কথা । শরৎ প্রভাসের সামনে চা এনে দিলে। সে খুব সরপাড় একখানা ধতি পরেছে, হাতে গোছা সোনার চুড়–মায়ের হাতের বালা ভেঙে ক-গাছা চুড়ি হয়েছিল, এই দ-গাছা তার মধ্যে অবশিষ্ট আছে ৷ জড়িয়ে এলো-খোঁপা বাঁধা, দেখলে ওকে উনিশ-কুড়ি বছরের