পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২১০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কেদার রাজা ૨૦૧ প্রভাস সোৎসাহে বললে, কেন নিয়ে যাব না ? বলন না আপনি কবে যাবেন ? মোটর তো রয়েছে—টানা মোটরে বেড়িয়ে আসবেন কলকাতা । —খবে ভাল কথা প্রভাসদা । যাব এর মধ্যে একদিন । একঘেয়েমি বরদাস্ত হয় না আর । প্রভাস একহাত জমি শরতের দিকে এগিয়ে বসল উৎসাহের ঝোঁকে । বললে—আপনাকে আজ নতুন দেখছি চটে, কিন্ত মনে হয় যেন আপনার সঙ্গে আমার আলাপ আজকের নয়, অনেক পরোনো । - কি জানি কেন, এ কথা শরতের কানে ভাল শোনালো না—সে নিজেকে কিছু দরে সরিয়ে নিয়ে গেল। প্রভাসের কথার কোন উত্তর সে দিলে না । প্রভাস বোধ হয় শরতের এ ভাব লক্ষ্য করলে । সে সরে বদলে বললে—আপনার বাবা বড় ভাল লোক, ও'কে আমার নিজের বাবার মত ভাবি । বাবার প্রশংসা শুনে শরতের মন আহলাদে প্ণ হয়ে গেল । তার বাবাকে গ্রামের কেউ প্রশংসা করে না, অন্ততঃ সে তো বড়-একটা শোনে নি কখনো কারো মুখে, এক রাজলক্ষী ছাড়া। কিন্ত রাজলক্ষী বালিকা মাত্র, তার মতামতের মুল্য কি ? শরৎ বললে, বাবার মত মান্য একালে হয় না । একেবারে সাদাসিদে, কিছই বোঝেন মা ঘোরপ্যাচ, গায়ের লোক কত রকম কি বলে, মজা দেখবার জুন্যে ও-কে নাচিয়ে দিয়ে কত রকম কি করে—সে-সব দিকে খেয়াল নেই । দেখনে প্রভাসদা, আমাদের অতিথিশালা- আছে বলে গায়ের লোক ইচ্ছে করে বাইরের লোক এনে বাবার ঘাড়ে চাপাবে। আমাদের অবস্থা অথচ সবাই জানে—কিস্ত বাবাকে জব্দ করা তো চাই । আমার এত দুঃখ হয় সময়ে সময়ে ! —আপনি বলেন না কেন কাকাকে বুঝিয়ে ? —আমার কথা উনি শোনেন, না কখনো শুনেছেন ? মাকেই বড় গেরাহ্যি করতেন, আর আমি ! যা খেয়াল ধরবেন, তাই করবেন। —আচ্ছা, আজ উঠি তা হলে । আর এক দিন আসবো এখন। কলকাতা যাওয়ার কথা মনে আছে তো ? একদিন নিয়ে যেতে আসবো কিন্ত । প্রভাস চলে গেলে শরৎ গাহকৰ্ম্মম শেষ করে সন্ধ্যা প্রদীপ জনালল। চারিদিকে বন-বাদাড়ে ঘেরা উঠোন, বেশ একটু শুীত পড়েছে-হেমন্ত কাল শেষ হতে চলেছে । শরৎ উত্তর দেউলে প্রদীপ দিয়ে এসে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকলো । বাবা কত রাত্রে ফিরবেন, ঠিক নেই—সে রান্না শেষ করে বসে থাকবে । একলা থেকে থেকে ভাল লাগে না সত্যই— এই নিবান্দা পরীতে, এই বন-বাদাড়ের মধ্যে। তার মন চায় একটু মানুষ জনের সঙ্গ, কারো সঙ্গে একটু কথাবাত্তা কওয়া যায়, কেউ একটা মজার গল্প বলে । তবুও কলকাতা থেকে প্রভাসদা এসেছিল, খানিকটা সময় কাটলো । © এই সময় যদি একবার রাজলক্ষী আসতো ! রান্না করতে করতে রাজলক্ষীর সঙ্গে গলপ করা যেতো তা হলে । মুখটি বজে কি করে মানুষ থাকতে পারে সারাদিন ? রান্না চড়িয়ে শরৎআপন মনে গনগন করে গান গাইতে লাগল— দাদা, কে বা কার পর কে কার আপন । কালশয্যা পরে মোহনিদ্রা ঘোরে দেখি পরস্পরে অসার আশার স্বপন—