পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


$ob বিভূতি-রচনাবলী এই গ্রামেই বারোয়ারির যাত্রায় শোনা গান। শরতের গলার সরে এক সময়ে খুব ভাল ছিল—এখন আর কিশোরীর বীণানিন্দিত সকণ্ঠ নেই—তবুও সে বেশ ভালই গায়। তবে রাজলক্ষী ছাড়া তার গান আর কেউ শোনে নি কখনও, এই যা দুঃখ ৷ এমন কি কেদারও শোনেন নি । এক বার সে বাইরে বের লো—বেশ জ্যোৎসনা আজ। শীতের আমেজ দিয়েছে বাতাসে– বাইরে এলে গা সির-সির করে । ছাতিম-বনে আর ছাতিম-ফুলের সুগন্ধ নেই—উত্তর দেউলে প্রদীপ দিতে গিয়ে সে দেখেছে । মনে কত সব অস্পষ্ট ইচ্ছা জাগে, কত কি করবার ইচ্ছে হয়, কত কি দেখবার ইচ্ছে হয়, এই বনের মধ্যে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই অবস্হায় থেকে মন হাঁপিয়ে ওঠে । অথচ এও সে জানে অন্য কোথাও গিয়ে সে বেশী দিন থাকতে পারবে না । তাদের গড়ের খালের দু-পাশে বনে ভরা, ঘরবাড়ি ভাঙা ইটের আর কাঠের স্তপ । কিন্ত শরতের সমস্ত অস্তিত্ব এই ভিটেটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। উত্তর দেউলে যখন সে প্রদীপ দেখাতে যায়—তখন বাদড়নখীর জঙ্গল, ছাতিমগাছের সারি, অন্ধকার কালো পায়রার দীঘি, ভাঙা মন্দির—এরা যেন তার জীবনে একটা সহায়ী শাস্ত অস্তিত্বের বাণী বহন করে আনে, যে অস্তিত্বটা শরতের কাছে একাত সত্য ও বাস্তব । নীল আকাশের তলায় দর্পরের ঝমােঝম রোদে কালো পায়রার দীঘিতে সে কতদিন নেমেছে ক্ষার কাচতে, কিংবা কুলের থলে মেলে দিয়েছে উঠানের মাচানের ওপর—বাবা হয়তো ঘরে ঘুমিয়ে, কিংবা হয়তো বাড়ি নেই—সেই সময় কতবার তার মনে হয়েছে নানা অদ্ভুত কথা—বহৃদরের কোনো নাম-না-জানা দেশ থেকে সে জন্মেছে এসে এই গড়বাড়ির রাজবংশে—ষে রাজবংশে সে আর তার বাবা চলে গেলে বাতি দিতে আর কেউ থাকবে না । সে রাজবংশের মেয়ে—রপেকথার রাজকন্যা, রক্ষ চুলে তেলের অভাব তখন তার মনে থাকে না, ভাঁড়ারের চালডালের দৈন্য, ছোঁড়া কাপড়ের প:টুলি বাঁশের আড়ার ওপর—এসব সে ভুলে যায় । সে রাজার মেয়ে—রাজকন্যা । ঐ নীল আকাশ, ঐ ছাতিম-বনের সারি, ঘুঘু-কোকিলের দল, সারা দেশ, সারা পথিবী তার অস্তিত্বের দিকে সসম্প্রমে চেয়ে আছে কিসের অপেক্ষায়—গভীর রহস্যভরা তার মহিমান্বিত অস্তিত্বের দিকে । আবার এক এক সময় ভুল ভেঙে যায় । সে তখন বড় ছোট হয়ে পড়ে। যখন রাজলক্ষীদের বাড়ি চুপি চুপি কাঠা হাতে চাল ধার করতে যেতে হয়, কলর তাগাদাকে হজম করতে হয়, পয়সার অভাবে ঘৰ্ম্মান্ত মখে হেইও হেইও করে সাবানদেওয়া ময়লা কাপড়ের রাশি কাচতে হয় নিজ’ন দীঘির ঘাটে—তখন সে হয় নিতান্ত গরীবের ঘরের মেয়ে, হয়তো বাগদী কিংবা দলে—তার কোনো লৎজা নেই, সঙ্কোচ নেই, অপমান নেই—নিজের জন্যে নয়, নিজের কন্ট সে কোনোদিন গ্রাহ্য করেও নি, কিন্ত বাবার জন্যে সে করতে পারে না এমন কাজই নেই-বাবার এতটুকু কণ্ট সে দেখতে পারবে না কোনোদিন--- তার নিঃসস্তান মাতৃত্ত্বের সবটুকু স্নেহ গিয়ে পড়েছে বাবার ওপরে। বাবা বন্ধ হয়ে পড়েছেন, সব জিনিস হয়তো ঠিক মত বুঝতে পারেন না–তাঁকে আগলে বেড়ানো উচিত সব সময় । মা যখন নেই, তখন তাকেই করতে হবে বাবার সব কাজ । তাঁর সব সুখ-সবিধে তাকেই