পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২৯১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ՏԵt} বিভূতি-রচনাবলী —কত ভাড়া দিতে হবে ? —তিন টাকা দিও, তোমাদের এ পাড়ার ভাড়া তো বাঁধাই আছে। ওই খেদি বিবি যায়, বড় পারলে বিবি সেদিন গেল—তিন টাকা দিলে । আমি যাস্তি লেবো না । শরৎ দরদপ্তর করতে জানে না । দ্য টাকার জায়গায় তিন টাকা ভাড়ায় সওয়ারি পেয়ে গাড়োয়ান মনের আনন্দে গড়ি ছটিয়ে দিলে । গড়ের মাঠ দিয়ে যখন গাড়ি চলেছে, তখন শরতের মনে হ’ল একটা বিশাল জনস্রোতের মধ্যে সেও একজন। প্রকাণ্ড মাঠটার মধ্যে দিয়ে কত রাস্তা, কত গাড়ি গোড়া, ট্রাম গাড়ি, লোকজন ছুটেছে, চলেছে—দরে গঙ্গাবক্ষে বড় বড় জাহাজের মাস্তল দেখা যাচ্ছে। সকলের ওপর উপড়ে হওয়া নীল আকাশের কতটা দেখা যাচ্ছে, মনচুকুন্দ চাপাগাছের সারির নিচে সাহেবদের ছেলেমেয়েদের ঠেলে নিয়ে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট ঠ্যালা গাড়িতে—জীবনটা ছোট নয়, সংকীর্ণ নয় – এত বড় জগতে যদি সবাই বেচে থাকে নিজের নিজের পথে— সেও থাকবে । ভগবান তাকে পথ দেখিয়ে দেবেন। গাড়িতে বসে গতির বেগে মন যখন পুলকিত, তখন অনেক কথা এমন অলপ সময়ের জন্যে মাথায় আসে, শরীরের জড়তার সদেীঘ* অবসরে নিপ্রভ ও অলস মন যা কখনো কল্পনা করতে পারে না - এই অলপ সময়টুকুর মধ্যেই শরৎ অনেক কথা ভেবে ঠিক করলে । সে আর গড়শিবপুরে ফিরবে না । বাবা সেখানে গিয়ে আছেন, হয়তো তিনি গিয়ে বলেছেন মেয়ে তাঁর মারা গিয়েছে । সে গেলেই গ্রামে কলঙ্ক রটবে । সে কলঙ্কের হাত থেকে বাবাকে সে রক্ষা করবে । কোথায় সে যাবে ? তা সে জানে না আজ, যদি কখনো কারো অনিষ্ট চিন্তা না করে থাকে জীবনে, কখনো অন্যায় না করে থাকে- তবে সেসবের জোর নেই জীবনে ? কালীঘাটে পৌছে সে গঙ্গায় ডুব দিলে, তার পর আর কোথাও যাওয়া নিরাপদ নয় ভেবে সে কালী-মন্দিরের সামনে চুপ করে বসে রইল । সন্ধ্যার আরতি আরম্ভ হ’ল । কত মেয়ে সাজগোজ করে আরতি দেখতে এল। তার মধ্যে ও চুপ করে বসে বসে সকলের দিকে চেয়ে দেখলে । কত বাধা এসে দোরের কাছে ওর পাশে বসলো । রারি বেশী হ’ল । ও ভাবলে কোথায় যাবে এখন । কোনো জায়গা নেই যাবার । এত বড় বিশাল শহরে অসহায়, তরণী নারীর পক্ষে নিরাপদ স্থান কোথায় এই দেবমন্দির ছাড়া । সুতরাং সে বসেই রইল । বসে বসে মনে পড়লো বাবার কথা । গড়শিবপুরের জঙ্গল-ঘেরা বাড়িতে বাবাকে একা হয়তো এতক্ষণ হাত পড়িয়ে রোধে খেতে হচ্ছে। আনাড়ি মানুষ, কোন দিন জীবনে কুটোটা ভেঙে দখোনা করার অভোস নেই, বেহালা বাজিয়ে আর গান গেয়েই নিশ্চিন্ত দিনগুলো কাটিয়ে এসেছেন বাবা-শরৎ তাঁর গায়ে অচিটুকুও লাগতে দেয় নি। আজ সে থেকেও নেই, বাবার কি কষ্টই হচ্ছে । তার কথা মনে ভেবে বাবার কি শাস্তি আছে ? শরতের চোখে জল এল । বাবার কথা মনে পড়লে মন হু-হন করে। সে কিছুতেই চুপ করতে পারে না, ইচ্ছে হয় সে এখনি ছুটে চলে যায় সেই গড়শিবপুরের ভাঙা বাড়িতে, বড় কাঁঠাল কাঠের পি-ড়িখানা বাবাকে পেতে দেয় রান্নাঘরের কোণে–একটা চটা-ওঠা কলাইকরা পেয়ালায় বাবাকে চা করে দিয়ে ছোট্ট খকেীর মত বাবার মুখের দিকে চেয়ে বসে বসে গল্প শোনে । মন্দিরের সামনে নাটমন্দিরে একজন সন্ন্যাসীনি ধনি জালিয়ে বসে আছে-ওর নজর পড়লো। তার চারিপাশ ঘিরে অনেক মেয়েছেলে জড়ো হয়ে কেউ হাত দেখাচ্ছে, কেউ ওষধ নিচ্ছে, কেউ শাধন বা কথা শুনছে। শরৎ সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে এই দেবমন্দিরের