পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/২৯৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কেদার রাজা *S& বেঞ্চিতে। তার স্বাভাবিক সেবা-প্রবত্তি এখানেও সজাগ আছে। গিন্নী বললেন, কোন ইসিটশান রে মিন ? তেরো-চোদ্দ বছরের মেয়েটি মুখ বাড়িয়ে বললে, ব্যাডেল জংশন— —সব শয়ে পড় তোরা । শরৎ ওদের বিছানা করে দাও— মিন তাড়াতাড়ি বলল, আমি বিছানা পেতে নিচ্ছি মা—আমার পাতাই আছে । শরৎ অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে চাইল । বাঃ, বেশ মেয়েটি। এতক্ষণ চুপ করে লাজকের মত আপন মনে বসে ছিল । পথে তার পর মেয়েটির সঙ্গে ওর বড় ভাব হয়ে গেল । ওর ভাল নাম মণাল, মদ স্বভাব, হৃদয়বতী। ও শরৎকে কি চোখে দেখে ফেলেছে, দিদি বলে ডাকে, লুকিয়ে হাতের কাজ কেড়ে নেয় । জামালপরে বদল করে ওরা গেল প্রথমে মঙ্গেরে। সেখানে গিন্নীর ছোট ঠাকুর-পো চাকরি করে । গঙ্গার ধারে বেশ ভাল বাসা । তিন দিন ধরে ওরা কাটাল সেখানে, শরৎ মিনকে সঙ্গে নিয়ে কণ্টহারিণীর ঘাটে রোজ স্নান করে আসে। গহিণীর বাতের ধাত, তিনি বাথরুমে স্নান করেন। - - কণ্টহারিণীর ঘাটে প্রথমে যে দিন গিয়ে দাঁড়াল, শরতের মন অভিভূত হয়ে পড়ল— গঙ্গার রুপ দেখে । একদিকে জামালপুরের মাবক পাহাড়ের লম্বা টানা সনীল রেখা, সামনে প্রশস্ত পণ্যতোয়া জাহ্নবী, দু-একখানা পালতোলা নৌকা নদীবক্ষে, কত স্নানাথীর যাতায়াত ৷ পৃথিবীতে এমন সন্দের জায়গাও আছে ? আবার চোখে জল আসে, শরৎ দেখে নি কখনো এসব । মিন বললে, দিদি চেয়ে দ্যাখো -এই যে ভাঙা পচিল না ?—এখানে মীরকাসিমের দগে" ছিল । ওই যে ফটক দিয়ে এলাম-দেখলে তো ? —তোর দিদি মুখ্য মেয়ে, তোরা এ কালের ইস্কুলে পড়া মেয়ে—দ্বিদিকে একটু শিখিয়ে নে। মীরকাসিমের দাগ" বললে তো—কে ছিল সে ? —আহা দিদি, তুমি কিচ্ছ জান না। শোনো বলি – তার পর মিন বিজ্ঞভাবে কুলে সদ্য-অধীত ইতিহাসের বিদ্যা সবিস্তারে জাহির করে। শরৎ চোখ বড় বড় করে বলল -ও ! দিন বেশ কেটে যায়। একদিন সবাই মিলে চন্ডীর মন্দিরে পজো দিতে গেল, আর একদিন গেল সীতাকুণ্ড । মঙ্গের থেকে ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে গমের ক্ষেত, ছোলার ক্ষেতের পাশের পথ দিয়ে গিয়ে, কত ছোট বড় বস্তি ছাড়িয়ে কতখানি বেড়িয়ে এল সবাই মিলে । পাহাড় জিনিসটা শরতের কাছে একটা বিস্ময়ের বস্ত । প্রথম যেদিন মিন ওকে দেখালে ঐ দ্যাখো দিদি জামালপরের পাহাড়—শরৎ অপলক চোখে চেয়ে রইল সেদিকে। তারপর আরো ভাল করে দেখলে যেদিন মঙ্গের থেকে ওরা বখতিয়ারপর রওনা হ’ল । কাজরা স্টেশনের কাছে এবং স্টেশন ছাড়িয়ে বাঁদিকে সে কি লম্বা, উ"চু পাথরের পাহাড় - এত বড় বড় পাথর যে আবার হয়, তার এত বড় গুপে হয়—এ কথা কে আবার কবে ভেবেছিল ? কিউলের কাছাকাছি এসে দরে দরে কত নীল পাহাড়-- শরৎ অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। দেখে মনে আনন্দ হয়, দুঃখও হয় -কেবলই মনে হয় বাবাকে এসব সে যদি আজ দেখাতে পারত !