পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৩৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ෆ්ථ8 বিভূতি-রচনাবলী শরৎ ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, আপনি জানেন না জ্যাঠামশায়, বাবার চিরকাল একরকম গেল আর যাবেও । আজ বলে না, কোন কালে ও'র ছিল জ্ঞান, ওকেই জিজ্ঞেস করন না ? গোপেশ্বর মিটমাটের সরে বলেন, না না, কাল থেকে রাজামশাই আর দেরি করা হবে না । শরতের বড় কষ্ট হয়, কাল থেকে আমি সকাল সকাল নিয়ে আসবো মা, রাত করতে দেবো না— এই দই বন্ধের ওপর শাসনদণ্ড পরিচালনা করে শরৎ মনে মনে খাব আমোদ পায় এবং এদের সঙ্কোচজড়িত কৈফিয়তের সরে যথেষ্ট কৌতুক অনুভব করে—কিন্ত কোনো তজজনগুজনেই বিশেষ ফল হয় না, প্রতি রাত্রেই যা তাই—সেই রাত একটা । নিউজ’ন গড়বাড়ির জঙ্গলে ঝিঝি পোকার গভীর আওয়াজের সঙ্গে মিশে শরতের শাসনবাক্য ব্যথাই প্রতি রাত্রে নিশীথের নিস্তবধতা ভঙ্গ করে । শরৎ বলে—আজ কিছু নেই বাবা, কি দিয়ে ভাত দেবো তোমাদের পাতে ? হাট না, বাজার না, একটা তরকারি নেই ঘরে, আমি মেয়েমানুষ যাবো তরকারি যোগাড় করতে ? ওল তুলেছিলাম কালে পায়রার পাড় থেকে একগলা জঙ্গলের মধ্যে—তাই ভাতে আর ভাত খাও—এত রাত্তিরে কি করবো আমি ? r কেদার স্কুচিত ভাবে বললেন, ওতেই হবে—ওতেই হবে— —তুমি না হয় বললে ওতেই হবে । জ্যাঠামশায় বাড়িতে রয়েছেন, ও’র পাতে শুধ ওল ভাতে দিয়ে কি করে— গোপেশ্বর তাড়াতাড়ি বলেন, যথেস্ট মা যথেষ্ট । তুমি দাও দিকি । ভেসে যাবে— কাঁচালঙ্কা দিয়ে ওল ভাতে মেখে এক পাথর ভাত খাওয়া যায় মা— —তবে খান। আমার আপত্তি কি ? ' —কাল গেয়োহাটির হাট থেকে আমি ঝিঙে পটল আনবো দটো—মনে করে দিও তো ? শরতের কি আমোদই লাগে ! কতদিন পরে আবার পরাতন জীবনের পুনরাবৃত্তি চলছে —আবার যে প্রতি নিশীথে গড়বাড়ির জঙ্গলের মধ্যে তাদের ভাঙা বাড়িতে সে একা শয়ে থাকবে } বাবা এসে অপ্রতিভ কণ্ঠে বলবেন—ও মা শরৎ দোর খুলে দাও মা,—এসব কখনো হবে বলে তার বিশ্বাস ছিল ? সেই সব পরানো দিন আবার ঠিক সেই ভাবেই ফিরে এসেছে-:—জ্যাঠামশায়ের জন্যে একটু দুধ রেখেছি—ভাত ক'টা ফেলবেন না জ্যাঠামশায়— গোপেশ্বর ব্যস্তভাবে বললেন, কেন, আমি কেন—রাজামশায়ের দধে কই ? —বাবার হবে না। দ-হাতা দুধ মোটে— g —না না সে কি হয় মা ? রাজামশায়ের দুধ ও থেকেই-- কেদার ধীরভাবে বললেন, আমার দধের দরকার নেই। আমরা রাজা-রাজড়া লোক, থাই তো আড়াইসের মেরে একসের করে খাবো । ও দু-এক হাতা দধে আমাদের— কথা শেষ না করেই হা হা করে প্রাণখোলা উচ্চ হাসির রবে কেদার রান্নাঘর ফাটিয়ে তুললেন । এইরকম রাত্রে একদিন গোপেশ্বর ভয় পেলেন কালোপায়রা দীঘির পাড়ের জঙ্গলে । বেশী রাত্রে তিনি কি জন্যে দীঘির পাড়ের দিকে গিয়েছিলেন—সেদিন আকাশে একটু মেঘ ছিল, ঘুম ভেঙে তিনি রাত কত তা ঠিক আন্দাজ করতে পারলেন না। দীঘির জঙ্গলের দিকে একাই গেলেন। কিন্ত কিছুক্ষণ পরে কোথায় যেন পদক্ষেপের শব্দ তাঁর কানে গেল— গর গভীর পদক্ষেপের শব্দ । উৎকণ' হয়ে কিছুক্ষণ শনে গোপেশ্বরের মনে হ’ল তাঁরই কাছাকাছি গভীর বনঝোপের মধ্যে কে যেন সাবধানের সঙ্গে ধীরে ধীরে পা ফেলে চলেছে—