পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৫৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ভঙুলমামার বাড়ি পাড়াগাঁয়ের মাইনার স্কুল । মাঝে মাঝে ভিজিট করতে আসি, আর কোথাও থাকবার জায়গা নেই, হেডমাস্টার অবিনাশবাবরে ওখানেই উঠতে হয় । অবিনাশবাবকে লাগেও ভাল, বছর বিয়াল্লিশ বয়স, একহারা চেহারা, বেশ ভাবকে লোক । বেশী গোলমাল ঝঞ্জাট পছন্দ করেন না, কাজেই জীবনের পথে বাধা ঠেলে অগ্রসর না হতে পেরে দেবলহাটি মাইনার স্কুলের প্রধান শিক্ষকরপে পনেরো বছর কাটিয়ে দিলেন এবং বাকী পনেরোটা বছর যে এখানেই কাটাবেন তার সম্ভাবনা ষোল আনার ওপর সতেরো আনা । কাত্তিক মাসের শেষে হেমন্ত সন্ধ্যা । স্কুলের বারান্দাতে ক্লাস-রমের দখান চেয়ার টেনে নিয়ে আমরা গল্প করছিলাম । সামনের একটা ছোট মাঠ, একপাশে একটা বড় তুতিগাছ, একপাশে একটা মজা পুকুর । সামনের কাঁচা রাস্তাটা গ্রামের বাজারের দিকে গিয়েচে । সহানটা নিজজন । চায়ের কোন ব্যবস্হা এখানে হওয়া সম্ভব নয়, তা জানি একটি গরীব ছাত্র হেডমাস্টারের বাসায় থেকে পড়ে আর তাঁর হাটবাজার করে। সে এসে দুটো রেকাবিতে ঘি-মাখানো রুটি, আল চচ্চড়ি ও একটু গড় রেখে গেল । আমি বললাম—অবিনাশবাব, বেশ ঠান্ডা পড়েছে—বেশ গরম মুড়ি খাবার ইচ্ছে হচ্চে, কিন্ত--- —হ’্যা, হ’্যা—সাটেনিলি—ওরে ও কানাই, শোন, শোন, যা দিকি, একবার গঙ্গার বউয়ের বাড়ি, আমার নাম ক'রে বলগে, দটি গরম মুড়ি ভেজে দ্যায়—এক্ষণি••• আমি বললাম, অভাবে চালভাজা--- তারপর গল্পগজেবে আধঘণ্টা কেটে গেল । অবিনাশবাক কথা বলতে বলতে কেমন অন্যমনসকভাবে মাঝে মাঝে বাঁ-ধারের মজা পুকুরটার দিকে চাইছিলেন । হঠাৎ বললেন— মড়ি আসকে, একটা গল্প বলি ততক্ষণ । শুনন, ইন্সপেক্টারবাব । এইরকম শীতের সন্ধ্যাতেই কথাটা মনে পড়ে । আপনাকে পেয়ে মনে এত আনন্দ হয় -এখানকার লোকজন দেখেচেন তো ? সব দোকানদার, লেখাপড়ার কোন চচ্চ নেই, ছেলেপিলেকে লেখাপড়া শেখায় এইজন্যে যে কোন রকমে ধারাপাত আর শুভকরীটা শেষ করাতে পারলেই দাঁড়ি ধরাবে। কারর সঙ্গে কথা বলে সুখ পাই নে, ঝালমসলার দরের কথা কাঁহাতক আলোচনা করি বলন । ভদ্রঘরের ছেলে, না-হয় এসে পড়েচি পেটের দায়ে এই পাণ্ডববভিজাত দেশে, কিন্ত তা বলে মনটা তো–কলেজের দু-চার ক্লাস চোখে দেখেছিলামও তো—পড়াশুনো না-হয় নাই করেচি--- 曝 দেখলাম অবিনাশবাব কলেজের দিনগুলোর কথা এখনোও ভুলতে পারেননি । বেচারীর জীবনে জাঁকজমক নেই, আত্মপ্রতিষ্ঠার দরাশা নেই, সাহসও বোধ করি নেই । তাঁর যা-কিছল অভিজ্ঞতা, যা-কিছল কম নৈপুণ্য, সবই এই অনাড়-বর সরল জীবনধারাকে আশ্রয় ক’রে । কলেজের দিনগুলোতেই শহরের মখে দেখেছিলেন, আড়ম্বর বা বিলাসিতা— মনেরই বলন বা দেহেরই বলনে--ঐ কলেজের ক'টা বছরেই তার আরম্ভ ও শেষ । সে দিনগুলো যত দরে গিয়ে পড়চে, রঙীন মতির প্রলেপ তাদের ওপর যে তত বিচিত্র ও মোহময় হয়ে পড়বে এটা খুব স্বাভাবিক বটে। অবিনাশবাবু তামাক ধরিয়ে আমার হাতে দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন। —হগেলী জেলার কোনো এক গ্রামে ছিল আমার বাড়ি । আমি জিজ্ঞাসা করলাম,—ছিল কেন ? এখন নেই ? 下。歪 oーミ9