পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৬১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ööህ বিভূতি-রচনাবলী বাস তো করে না। বাড়ি কাজেই খারাপ হতে থাকে। তবুও তিনি বছরে দু-তিনবার যান বলে এখনও ঘরদোর টিকে আছে। পাতকুয়োর আর কত খরচ ? চৈত্র মাসের দিকে না হয় ক'রে দেওয়া যাবে। আর তোমরা সবাই যদি যাও, পাঁচল আষাঢ় মামেই ক’রে দেওয়া যাবে । - - বুঝলম পাঁচল পাতকুয়া এখনও বাকী । ভঙুলমামার বাড়ি এখনও শেষ হয় নি, এখনও কিছু বাকী আছে। কিন্তু এতদিন ধরে ব্যাপারটা চলচে যে, এক দিক গড়ে উঠতে অন্য দিকে ধরেছে ভাঙন । এর পরে মামার বাড়ি গিয়ে দু-একবার দেখেছি ভাডুলমামা দ-পাঁচ দিনের ছয়টি নিয়ে বাড়িতে এসে আছেন । এটা সারাচ্ছেন, ওটাতে বেড়া বাঁধছেন, এ-গাছটা খড়ছেন, ও-গাছটা কাটছেন। ছেলেরা আসতে চায় না কলকাতা ছেড়ে। নিজেকেই আসতে হয়, দেখাশনো করতে হয় বলে একদিন সলঙ্গজ কৈফিয়ৎও দিলেন ।-- পচিল ? হ’্যা তা পাঁচল—সম্প্রতি একটু টানাটানি যাচ্ছে--সামনের বর্ষায়---ঘরদোর বেধেছি সারাজীবন খেটে, ওই আমার বড় আদরের জায়গা—তোরা না থাকিস, আমিই গিয়ে থাকি । আমি বললাম,—ওখানে কেমন করে থাকেন ? সারা গাঁয়েই তো মানুষ নেই, মামার বাড়ির পাড়া তো একেবারে জনশন্য হয়ে গেছে । —কি করি বাবা, ওই বাড়িখানার ওপর বড় দম আমার যে। দেখ, চিরকাল পরের বাসায়, পরের বাড়িতে মানুষ হয়ে ঘরের কন্ট বড় পেয়েছিলম—তাই ঠিক করি বাড়ি একখানা করবই। ছেলেবেলা থেকে ওই গাঁয়েই কাটিয়েছি, ওখানটা ছাড়া আর কোথাও মন ঘসে না। চিরকাল ভাবতুম রিটায়ার করে ওখানেই বাস করব। একটা আস্তানা তো চাই, এখন না হয় ছেলেপিলে নিয়ে বাসায় বাসায় ঘরেছি, কিন্ত এর পরে দাঁড়াব কোথায় ? তাই জলাহার করেও সারাজীবন কিছু কিছু সঞ্চয় ক'রে ওই বাড়িখানা করেছিলাম। তা ওরা তা কেউ এল না—আমি নিজেই থাকি। না থাকলে বাড়িখানা তো থাকবে না—আর এককালে না-এককালে ছেলেদের তো এসে বসতেই হবে বাড়িতে । কলকাতার বাসায় বাসায় তো চিরকাল কাটবে না। তারপর মামাদের মুখে ভণভুলমামার কথা আরও সব জানা গেল । ভঙুলমামা একা বিজন বনের মধ্যে নিজের বাড়িখানায় থাকেন । তাঁর এখনও দঢ় বিশ্বাস তাঁর ছেলেরা শেষ পয্যন্ত ওই বাড়িতেই গিয়ে বাস করবে । তিনি এখনও এ-জায়গাটা ভাঙচেন, ওটা গড়চেন, নিজের হাতে দা দিয়ে জঙ্গল সাফ করচেন। ছেলেদের সঙ্গে বনে না-ওই বাড়ির দরনই মনান্তর, স্ত্রীও ছেলেদের দিকে । ছেলেরা বাপকে সাহায্যও করে না । ভ"ডুলমামা গাঁয়ে একখানা ছোট মদির দোকান করেছিলেন—লোক নেই তার কিনবে কে ? যা দু-একঘর খন্দের জটেছিল—ধার নিয়েই দোকান উঠিয়ে দিলে । এখন ভন্ডুলমামা এ-গাঁ ও-গাঁ বেড়িয়ে কোনো চাষার বাড়ি থেকে দ-কাঠা চাল, কারর বাড়ির পাঁচটা বেগন—এই রকম করে চেয়ে চিন্তে এনে বাড়িতে হাঁড়ি চড়িয়ে দটো ফুটিয়ে খান। তারপর ধীরে ধীরে অনেক বছর কেটে গেল । আমি ক্ৰমে বি-এ পাস করে চাকরিতে ঢুকলম। মামার বাড়ি আর যাই নে, কারণ সে-গ্রাম আর যাবার যোগ্য নয়। মামার বাড়ির পাড়ায় গাঙ্গলোঁরা, রায়েরা, ভড়েরা সব একে একে মরে হেজে গেল, যারা অবশিষ্ট রইল তারা বিদেশে চাকরি করে, ম্যালেরিয়ার ভয়ে গ্রামের রিসীমানা মাড়ায় না। ও-পাড়াতেও তাই জীবন মজুমদারের প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ির ছাদ ভেঙে ভূমিসাৎ হয়ে গিয়েছে, শুধ একদিকের দোতলা-সমান দেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে । যে পমজোর দালানে ছেলেবেলায় কত উৎসব দেখেছি, এখন সেখানে বড় বড় জগডুমরের গাছ, দিনেই বোধ হয় বাঘ লুকিয়ে থাকে।