পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


එ8 বিভূতি-রচনাবলী শ্লোকের উপদেশ মত চাকরিকে পরোভাগে বজায় ও ছটিছাটা, অপমান-অসুবিধাকে পশ্চান্দিকে নিক্ষেপ করতঃ কায়ক্লেশে দিন অতিবাহিত করিয়া চলিয়াছেন। নপেন কি বলিতে যাইতেছিল—দেবেনবাব বাধা দিয়া বলিলেন-মল্লিক য়্যাণ্ড চৌধুরীদের মটগেজখানা টাইপ করেছিলে ? নপেন কাঁদ-কাঁদ মুখে বলিল—আজ্ঞে, কই ওদের অফিস থেকে তো পাঠিয়ে দেয় নি এখনও ? —পাঠিয়ে দেয় নি তো ফোন কর নি কেন ? আজ সাতদিন থেকে বলছি—কচি থোকা তো নও ?•••যা আমি না দেখব তাই হবে না ? নপেনের ছয়টির কথা চাপা পড়িয়া গেল এবং সে বেচারী পুনরায় সাহস করিয়া সে-কথা উঠাইতেও পারিল না । সন্ধ্যার অলপ পর্বে ক্যাশ ও ইংলিশ ডিপার্টমেণ্টের কেরানীরা বাহির হইল—অন্য অন্য কেরানীগণ আরও ঘণ্টাখানেক থাকিবে । অত্যন্ত কম বেতনের কেরানী বলিয়া কেহই তাহাদের মখের দিকে চায় না, বা তাহারা নিজেরাও আপত্তি উঠাইতে ভয় পায় । দেউড়িতে দ্বারোয়ানেরা বসিয়া খৈনী খাইতেছে, ম্যানেজার ও সুপারিস্টেডেণ্টের যাতায়াতের সময় উঠিয়া দাঁড়াইয়া ফৌজের কায়দায় সেলাম করে, ইহাদিগকে পৌঁছেও না । ফুটপাথে পা দিয়া নপেন বলিল—দেখলেন অপব্ববাব, ম্যানেজার বাবর ব্যাপার? এক দিন সাড়ে তিনটের সময় ছয়টি চাইলাম, তা দিলে না—অন্য সব অফিস দেখনে গিয়ে দটোতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তারা সব এতৃক্ষণে ট্রেনে যে যার বাড়ি পৌঁছে চা খাচ্ছে আর আমরা এই বেরলাম—কি অত্যাচারটা বলন দিকি ? প্রবোধ মনুহরী বলিল—অত্যাচার ধ’লে মনে কর ভায়া, কাল থেকে এস না, মিটে গেল । কেউ তো অত্যাচার পোয়াতে বলে নি । ওঃ, ক্ষিদে যা পেয়েছে ভায়া, একটা মানুষ পেলে ধরে খাই এমন অবস্হা । রোজ রোজ এমনি—হাটের রোগ জন্মে গেল ভায়া, শধ না খেয়ে খেয়ে— অপর হাসিয়া বলিল—দেখবেন প্রবোধ-দা, আমি পাশে আছি, এ যাত্রা আমাকে না হয় রেহাই দিন। ধরে খেতে হয় রাস্তার লোকের ওপর দিয়ে আজকের ক্ষিদেটা শাস্ত করন। আমি আজ তৈরী হয়ে আসি নি। দোহাই দাদা ! তাহার দুঃখের কথা লইয়া এরপে ঠাট্টা করাতে প্রবোধ মনুহরী খাব খুশী হইল না। বিরক্তমখে বলিল, তোমাদের তো সব তাতেই হাসি আর ঠাট্টা, ছেলেছোকরার কাছে কি কোন কথা বলতে আছে--"আমি যাই, তাই বলি ! হাসি সোজা ভাই, কই দাও দিকি ম্যানেজারকে ব’লে পাঁচ টাকা মাইনে বাড়িয়ে ? হু, তার বেলা— অপকে হটিতে হয় রোজ অনেকটা । তার বাস শ্ৰীগোপাল মল্লিক লেনের মধ্যে, গোলদীঘির কাছে । তের টাকা ভাড়াতে নীচু একতলা ঘর, ছোট রান্নাঘর । সামান্য বেতনে দু'জায়গায় সংসার চালানো অসম্ভব বলিয়া আজ বছরখানেক হইল সে অপণাকে কলিকাতায় আনিয়া বাসা করিয়াছে । তবুও এখানে চাকরিটি জটিয়াছিল তাই রক্ষা --- শৈশবের স্বপ্ন এ ভাবেই প্রায় পৰ্য্যবসিত ইয়। অনভিজ্ঞ তরুণ মনের উচ্ছদাস, উৎসাহ— মাধষে"-ভরা রঙীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন-স্বপ্নই থাকিয়া যায়। যে ভাবে বড় সওদাগর হইবে, দেশে দেশে বাণিজ্যের কুঠী খলিবে, তাহাকে হইতে হয় পাড়াগাঁয়ের হাতুড়ে ডাক্তার, যে ভাবে ওকালতি পাশ করিয়া রাসবিহারী ঘোষ হইবে, তাহাকৈ হইতে হয় কয়লার দোকানী, যাহার আশা থাকে সারা পৃথিবী ঘরিয়া দেখিয়া বেড়াইবে, কি দ্বিতীয় কলম্বস হুইবে, তাহাকে হইতে হয় চল্লিশ টাকা বেতনের কুলমাস্টার।