পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ÖV8 বিভূতি-রচনাবলী জটেচে—তাস কিন্ত ভাল লাগে না। তাস খেলে জিতবো, অন্যদিন এতে কত উৎসাহ, আনন্দ পাই । আজ মনে হোল, না হয় জিতলামই, তাতেই বা কি ?—এদের গল্পগুজব ভাল লাগল না । অথ*হীন—অথহীন—এই নীচু বৈঠকখানা ঘর, চুন-বালি-খসা দেওয়াল, সেই সব একঘেয়ে সস্তা ওলিওগ্রাফ ছবি—কালীয়দমন, অন্নপণে"র ভিক্ষাদান, কি একটা মাথামড়ে ল্যান্ডস্কেপ—সেই একঘেয়ে কথাবাত্তা, চিরকাল যা শুনে আসচি—হঠাৎ মন বিরস ও বিরুপ হয়ে উঠল—সব বাজে, সব অথহীন,—পাশের একজনকে জিগ্যেস কল্পমে— আপনার রেশ ভাল লাগচে ? মনে কোনোরকম— সে অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল। বল্লে—কেন, ভাল লাগবে না কেন ? কেন বলনে তো ?— মন আরও তিক্ত হয়ে উঠল । কাজের ছাতোয় সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বেলা চারটে বাজে । ফিরিওয়ালারা গলির মধ্যে হকিচে–ছেলেরা বইদপ্তর নিয়ে স্কুল থেকে ফিরচে—কলের জল পড়বার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে—গলির মোড়ে রোয়াকে-রোয়াকে এরই মধ্যে আন্ডা বসে গিয়েচে । একটা নিতান্ত সর অন্ধকার গলি, পাশেই একটা মিউনিসিপ্যালিটির নাইবার জায়গা । এই গলিটা দিয়ে যাতায়াত প্রায়ই করি—মিউনিসিপ্যালিটির মাইবার জায়গাটার পাশে একটা খোলার ঘর। এই ঘরখানা ও তার অধিবাসীরা আমার কাছে বড় কৌতুহলের জিনিস । হাত পাঁচেক লম্বা, চওড়াতে ওই রকমই হবে, এই তো ঘরখানা। এরই মধ্যে একটি পরিবার থাকে, স্বামী স্ত্রী ও শিশসস্তান । না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত, এইটুকু ঘরে কি ভাবে এতুগালো প্রাণী থাকে—তাদের জিনিসপত্র নিয়ে কিন্ত: সকলের চেয়ে অবিবাসের বিষয় এই যে এই পাঁচ বগাঁহাত ঘরের এক কোণেই ওদের রান্নাঘর । আমি যখন ওখান দিয়ে যাই, প্রায়ই কিছু দেখতে পাই – উননে কিছল না কিছল একটা চাপানো আছে। বৌটি ছোট ছেলে কোলে নিয়ে রাঁধছে, না হয় দুধ জনাল দিচ্চে । তার বয়স দেখলে বোঝা যায় না—তেইশও হতে পারে, ত্ৰিশও হতে পারে, চল্লিশও হতে পারে । ঘোমটার কাছে ছোঁড়া, আধময়লা শাড়ি পরনে। হাতে রাঙা কড় কি রালি ; চোখ-মাখ নিপ্রভ, নিবন্ধিতার ছায়া মাখানো । স্বামী বোধহয় কোন কারখানাতে মিগীর কাজ করে, দু'একদিন সন্ধ্যার আগে ফিরবার সময় দেখোঁচ লোকটা কালিবুলি মেখে ছোট বালতি হাতে পাশের নাইবার জায়গায় ঢুকচে । আজও ওদের দেখলাম। দোরের কাছে বৌটি ছেলে কোলে নিয়ে বসে আছে, ছেলেকে আদর করচে । নিবোধের মত আমার দিকে একবার চেয়ে দেখলে । সেই পায়রার খোপের মত ঘরটা, ছিটেবেড়ার দেওয়ালে মাটির লেপ, তার ওপরে পরোনো খবরের কাগজ অটিা, কাগজগুলো হলদে বিবণ হয়ে গিয়েচে—দড়ির আলনায় ময়লা কাপড়-চোপড় ঝুলচে । মনটা আরও দমে গেল । কি ক'রে এরা এ থেকে আনন্দ পায় ? কি করে আছে ? কি অথfহীন অস্তিত্ব । কেন আছে ? আচ্ছা, ও ছেলেটা বড় হয়ে কি হবে ? ওই রকম মিশিী হবে তো, ওই রকমই খোলার ঘরে ছেলে বউ নিয়ে ওই ভাবেই মলিন, কুগ্ৰী, অন্ধকার অথহীন জীবনের দিনগুলো একে একে কাটাতে কাটাতে এগিয়ে চলবে ততোধিক দীন, হীন মরণের দিকে । অথচ মা কত আগ্রহে খোকাকে বকে অাঁকড়ে আদর করচে, কত আশা, কত মধর স্বপ্ন হয়তো—কিস্ত এখানেও আমার সন্দেহ এল । স্বপ্ন দেখবার মতো বৃদ্ধিও বোঁটির আছে কি ? কল্পনা আছে ? নিজেকে এমন অবস্হায় ভাবতে পারে যা বৰ্ত্তমানে নেই কিন্ত ভবিষ্যতে হতে পারে বলে ওর বিশ্বাস ? মনের গোপন সাধ-আশাকে মনে রপে দিতে পারে ? নিজের সংকীর্ণ, অসন্দের বক্তমানকে আলোক উৎজল ভবিষ্যতের মধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারে ?