পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৩৮৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


όθύ বিভূতি-রচনাবলী পেরাবলেটারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল কিন্তু বড় উচু—তাঁর ছোট্ট হাত দটি সেখানে পৌঁছয় না। সে একবার অসহায় ভাবে এদিক-ওদিক চাইলে, তারপর থপ করে বসে পড়ল । চাকরটা আয়ার সঙ্গে গল্পে মত্ত । কাছজনি-পাকের বেঞ্চির ওপর গিয়ে বসলাম । সয' অস্ত যাচ্চে, গঙ্গার অপর পারে আকাশ রাঙা হয়ে এসেচে । খোকার মনের সে অথহীন আনন্দ আমার মনে অলক্ষিতে কখন সংক্রামিত হয়েচে দেখলাম। খোলার ঘরের মেয়েটিকে আর নিবোধ মনে হোল না। বাইশ বছর খবরের কাগজের অফিসে সন্ধ্যার পর আছড়া চলছিল । “তরুণ' শব্দটার ওপর ভয়ানক জোর দিয়ে কথা বলা তখন দিনকতক খুব চলেছিল—সেই সময়কার ব্যাপার । তর,ণ সাহিত্যের ভবিষ্যৎ, তারণ্য, তরণ দণ্টিভঙ্গি, তরণে সমিতি, তরণের অভিযান, তরণের জয়যাত্রা— মাসিক পত্রিকা ও কথাসাহিত্য তখন তরুণ-বায়গ্রেস্ত । ওদিকে পরশুরাম তখন ‘কাঁচ সংসদ" গল্প লিখলেন তা নিয়ে দটো দলের সন্টি হোল, একজন বললে—আঃ, কি ঠোকাই ঠুকেচে । আর একজন বললে—যাদের নিজেদের জীবনের পজি বহনকাল ফুরিয়েচে, যাদের প্রাণের তারে মরচে ধরেচে, তারা তরণের মনকে বুঝবে কেমন করে । সমস্ত মহীগ্রাস করতে ছটেছে তরণের জয়রথ-চক্ৰ, তার উদাম, অশান্ত বেগের সামনে দড়িাবার ক্ষমতা ধরে, তাদের সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে চলবার পদ্ধ রাখে কোন ও ৬ ফসিল ?” ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটের ওপর শেষের দলটাই বেশী পণ্ট-তরণের বিরুদ্ধে যারা কথা বলছিল চেয়ে দেখলাম তারা সকলেই মধ্যবয়সী, অপর পক্ষে তরুণ ও প্রৌঢ় দুই-ই আছে—এবং স্বয়ং সম্পাদক যিনি, ষাট বৎসরের বন্ধ হলেও তিনি ছিলেন তরণের সপক্ষে । কাগজের অফিস থেকে বার হয়ে এসে একটা পাকের বেঞ্চিতে বসলাম । মনটা খারাপ হয়ে গেল। সত্যিই তরণেরাই জয়ী—কিন্তু সে বয়সটাকে বহনকাল হারিয়েচি । মাথার চুল ছ-আনা আন্দাজ পাকা, পরিচিত ছোকরার দল সামনে বিড়ি সিগারেট খায় না, হঠাৎ সামনাসামনি হোয়ে গেলে বিড়ি মুখে থাকলে তাড়াতাড়ি ফেলে দেয় । সমীহ করে কথা বলে— আর বয়োবন্ধ লোকের পরিচয় দিতে গেলেই বলে,-“আজ্ঞে তাঁর বয়েস হয়েচে, এই প্রায় আপনার বয়েসী হবেন ।” তা সে কি জানে চল্লিশ–কি জানে পঞ্চাশ—আমার বয়েসী, তাও ‘প্রায়’—অথাৎ আমিই বড় । কারণ কুড়ি, বাইশ,'প'চিশ বয়সের ছোকরারা চল্লিশে আর পঞ্চাশে বিশেষ কোনো তফাৎ দেখে না । এদিকে বাড়িতেও বড় সংসার, সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মথে বাবা’ বাবা’ অনবরত শুনতে শুনতে মনটাও অনেকটা গভীর প্রবীণদ্ধের দিকে ঝুকে চলেচে বৈকি। ছোট মেয়েটা কাছে এলেই বলে-বাবা তোমার পাকা চুল তুলে দেবো ? না, মনটা খারাপ হবারই কথা বটে। রাত রুমে বেশী হোল, পাকের মধ্যে কুলপীবরফওয়ালা হেকে যাচ্চে, মোড়ের মাথায় বেলফুলের মালা বিক্লী হচ্চে, রাস্তায় লোক চলাচল কমে কমে আসচে। জ্যোৎস্নারাত, চাঁদ ভাঙ্গা মেঘের মধ্যে লকোচুরি খেলচে। কত বছর বয়সের মানুষকে ঠিক তরণ বলা চলে ? উনিশ থেকে বরিশ, না আঠারো থেকে আটাশ, না কুড়ি থেকে প"চিশ ? এ-বয়েস একদিন আমারও ছিল—ওর চেয়েও কম ছিল। কিন্তু তখন কেউ বলে দেয় নি যে আমি তরণ বা তার জন্যে একটা কিছু হয়েচে।