পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৪২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৪২২ বিভূতি-রচনাবলী প্রাচীন বটগাছটা, আইনন্দির বাড়ির মোড় থেকে দেখতে পাওয়া সেই দরপ্রসারীদিগনলয়— আজ আবার মেঘভাঙা রাঙা অস্ত সমযে’র রোদ পড়েচে দরের সেই সব বাঁশবন, শিমলবনের মাথায়, ঝিঙে খেতে ফুল ফুটেচে, বৈশাখের গায়ক পাখী পাপিয়া আর 'বেী-কথা-কও’ চারিদিকে ডাকচে, বেলেডাঙার হাজারী ঘোষ গোরর পাল নিয়ে নতিডাঙার খড়ের মাঠ থেকে বাড়ি ফিরচে, মেয়েরা মরগাঙের ঘাট থেকে কলসী করে জল নিয়ে যাচ্চে,—কি সন্দের শাস্ত গ্রাম্য দশ্য, একবার মনে হ’ল পাটশিমলের সেই কালীবাড়ি ও দেবোত্তর বশিঝাড়ের কথা । আজ দােপর বেলা সেখানে ছিলাম, কালীবাড়ির পেছনের এক গহসেহর বাড়ির বেী প্রতিবেশিনীকে ডেকে বলছিল—ও সেজ বোঁ, একটু তরকারী দেবো, খাকীকে দিয়ে বাটি পাঠিয়ে দ্যাও তো ! সন্ধ্যার আগে কতদরে এসে গিয়েচি ৷ সন্ধ্যাও হল, বাড়ি এসে পা দিলাম, আমার পথ চলাও ফুরলে ৷ আজ শরতের অপব দাপরে পাগল করেচে আমায়। অনেক দিন লিখি নি—নানা গোলমালে অবসাদে মনটা ভাল ছিল না—আজ রবিবার দিনটা দাপরে একটু ঘুমিয়ে উঠেচি —কি পরিপণ ঝলমলে শরতের দাপরে। এর সঙ্গে জীবনের কি যে একটা বড় যোগ আছে— ভাদমাসের এই রোদভরা দােপর কেন যে আমায় পাগল করে তোলে । বনে বনে মটরলতার কথা মনে পড়ে, ইছামতীর ঘোলা জল, পাখীর ডাক—মনটা যেন কোথায় টেনে নিয়ে যায় ! সব কথা প্রকাশ করা যায় না—কারণ আনন্দের সবটা কারণ আমারই কি জানা আছে ? কি করচে খকু এই শরৎ দপরে, বকুলতলায় ছায়ায় ছায়ায়, একথাও মনে এসেছে। ওর কথা ভেবে কষ্ট হয় যে, ওর লেখাপড়া হ’ল না। কাল দিনটি বড় সদর কেটেচে, তাই আজ মনে হচ্চে আজ সকালটিও বড় চমৎকার । অনেকদিন কলকাতায় একঘেয়ে জীবনযাত্রার পরে কাল বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রথমেই তো খয়রামারি মাঠে দর্পরের রোদে বেড়াতে গিয়ে সবুজ গাছপালা লতাপাতার গন্ধে নতুন জীবন অনুভব করলাম। হাওয়াতেও একটা তাজা গন্ধ আছে যা কিন্ত শহরে নেই। ঝোপে থোলো থোলো মাখম শিমের নীলফুল ফুটেচে, মটরলতার সবুজ ফল ও সৌদালি গাছের কাঁচা সীটি বন-জঙ্গলের শোভা কত বাড়িয়েচে—তাদের ওপর আছে শরতের মেঘমুক্ত সনীল আকাশ, আর আছে তপ্ত সযf্যালোক। প্রতিবারই দেখোঁচ নতুন যখন কলকাতা থেকে আসি এমন একটা আনন্দ পাই । মনে হয় এই তো নীলাকাশ আছে মাথার ওপর, চারিপাশে বেটন করে রয়েছে ঘন সবুজ গাছপালার ঝোপ, পাখীর ডাক আছে, বনফুলের দলনিও আছে—এ থেকে তো এতই আনন্দ পাচ্চি—তবে কেন মিথ্যে পয়সা খরচ করে দরে যাই । দর আমায় কি দেবে, এমন কি দেবে যা এখানে আমি পাচ্চি নে ? আসল কথা দরও কিছ নয়, নিকটও কিছ নয়—প্রকৃতি থেকে আনন্দ সংগ্রহ করবার মত মনের অবস্হা তৈরী হয়ে যদি বায় তবে যে কোনো জায়গায় বসে দটো গাছপালা, একটুখানি সবুজ ঘাসে ভরা মাঠ, দটো বন্য পক্ষীর কলকাকলী, বনফুলের শোভাতেই পরিপণ আনন্দ লাভ করা যায়। কাল বারাকপরে গেলাম সকাল বেলা। দপরে ইছামতীতে স্নান করতে গিয়ে সত্যি বড় আনন্দ পেয়েচি। কুলে কুলে ভরা নদী, দু-ধারে অজস্র কাশফুল, আরও কত কি লতা ঝোপ, বর্ষার জলে সব ঘনসবজে-চকচক করচে কালো কচুর পাতা, মাখম শিমের নীল ফুল ফুটেচে—একটা গাছে সাদা সাদা বড় বড় ঢোল-কলমীর ফুলও দেখলাম ।