পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৪৫৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8ტ8 বিভূতি-রচনাবলী পাপরাজি, তার মেয়েদের দেখবে, চিনবে, ভালও বাসবে । আমি এই নেশাতেই প্রতি বৎসর এই সময় বেরিয়ে পড়ি । বাগানগায়ের পথে বড় একটা বট গাছের তলায় বসে লিখচি । চারি ধারে মাঠ, বটি পড়চে ঝর ঝর করে, বেলা কত হয়েচে মেঘে আন্দাজ করা যায় না, জোলো হাওয়ায় আউশের ভু’ই থেকে ধানের কচি জাওলার মদ সগন্ধ ভেসে আসচে, বট গাছের ডালে কত কি পাখী ডাকচে, মাঠের মধ্যে অসংখ্য খেজুর গাছ । চাষারা ক্ষেতে নিড়েন দিচ্চে, তামাক খাচ্চে, নীল মেঘের কোলে বক উড়চে । কাঁচিকাটা পলে পার হয়ে খানিকটা এসেই একটা লোকের সঙ্গে আলাপ হোল। তার বয়েস ষাট-বাষটি হবে, রঙটা বেজায় কালো, হাতে একটা পেটিলা, কাঁধে ছাতি । আমি বললাম—কোথায় যাবে হে ? সে বললে—আজ্ঞে দাদাবাব, ষাঁড়াপোতা ঠাকুরতলা যাব । বাড়ি শান্তিপর গোঁসাইপাড়া। লোকটা বললে—একটা বিড়ি খান দাদাবাধ । বেশ লোকটা । ও রকম লোক আমার ভাল লাগে । সহজ সরল মানুষ, এমন সব কথা বলে যা আমি সাধারণতঃ শনি নে । সন্দরপরে আসতে প্রমথ ঘোষ সাইকেল চেপে কোথায় যাচ্চে দেখলাম। আমি আর আমার সঙ্গীদ-জনে মোল্লাহাটির খেয়াঘাটে পার হই। সদর মেঘাচ্ছন্ন সকাল বেলা নদীজল শাস্ত, ওখানে সবজে কষাড় বন । খেয়া পার হয়ে কেউটে পাড়া, মড়িঘাটা ছাড়িয়ে আমরা গোবরাপর এলাম। আর বছর বাজারের যে দোকানে তামাক খেয়েছিলাম, সেখানে আমরা তামাক খাবার জন্যে বসতে গিয়ে দেখি গোবরাপরের জজবাবর সেজছেলে মল্লিনাথ বসে আছে । সে আমাকে দেখে টানাটানি করতে লাগল তাদের বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে । অন্ততঃ চা খেয়েও যেন যাই । তার দাদা রামকৃষ্ণ-মিশনের সন্ন্যাসী, অনেকদিন পরে বাড়ি এসেচেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই হবে । তিনি নাকি আমার বই-এর খুব অনুরাগী ইত্যাদি বলে বাড়ি নিয়ে গেল । আমার সঙ্গীকেও সে নিমন্ত্রণ করলে । ওদের মস্ত বড় বাড়ি, আর কত যে ছেলে মেয়ে । সব ভাইগুলি বড় চাকরি করে বিদেশে, এবার বাড়িতে ওদের সন্ন্যাসী ভাই এসে রামকৃষ্ণ-উৎসব করচেন সেই উপলক্ষে সবাই এসেচে। ওপরের ঘরে মেয়েরা গান গাইচে, বাইরের বৈঠকখানায় ছেলেরা তাস খেলচে-হৈ হৈ কাণ্ড। আমরা চা খাবার থেয়ে ভদ্রতা বজায় রাখার উপযুক্ত একটু গল্পগুজব করে তখনি আবার পথে বার হলাম। পথে বার হয়ে কোথাও একদণ্ড থাকতে আমার ভাল লাগে না । আমার সঙ্গীটি যাবে পাশেরই গ্রামে তার জামাই-বাড়িতে। ওরা আচাৰ্য' বামন, এতক্ষণ নিজের মেয়ের ভাসরের কথা বলতে বলতে আসছিল। সেই ব্যক্তিটি ঘরে খবে সন্দরী শী থাকা সত্ত্বেও পয়তাল্লিশ বছর বয়সে ছেলে না হওয়ার অজুহাতে, আজ দ্ব-মাস হোল পনরায় দ্বিতীয় বার দার-পরিগ্রহ করেচে। সেই গল্প সে আমাকে নানাভাবে শোনাচ্ছিল । হঠাৎ জজ বাবদের বাড়ি থেকে বেরিয়েই সে আমার ওপর অত্যন্ত ভক্তিমান হয়ে উঠল। জজ বাবদের বাড়িতে আমার আদর-ষত্ব দেখেই বোধ হয় ওর মনের ভাবের এ পরিবত্তনটুকু হোল। বললে, দাদাবাব, আপনাকে এতক্ষণ চিনতে তো পারি নি। আপনি মাথা থেকে বের করে এমন একখানা বই লিখেচেন যার অত বড় দামী দামী লোকে এত সংখ্যাতি করলেন, তখন তো আপনি সাধারণ মানুষ नन ! সম্বমে ও শ্রদ্ধায় তার সর গদগদ হবে উঠেচে, তারপর বললে, তবে বাব; যদি অনুমতি করেন, আমিও নিজের পরিচয়টা দিই। এতক্ষণ দিই নি, কারণ বিদেশে, পথঘাটে, নিজের পরিচয় না দেওয়াই ভাল। দিয়ে কি হবে ? আমার নাম নদে শান্তিপর থেকে আরম্ভ করে