পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৪৫৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8&o বিভূতি-রচনাবলী তারা আমায় খাতির করে বসালে, বিড়ি খেতে দিলে, রেকডের বাক্স এগিয়ে দিয়ে বললে,— বলন বাব, কোন গান আপনার পছন্দ ! সামনের জলাশয়টা শুনলাম জামদার বাঁওড়ের আগড় । কি সুন্দর যে তার দশ্য সেই বটতলা থেকে । বাঁওড় অথাৎ মজা নদী । তার ওপারে যতদর দটি যায় বড় বড় নিবিড় বাঁশবন জলের ওপর ঝুকে পড়েচে–পদমফুল আর পদমপাতায় জল দেখা যায় না, আরও ওদিকে শেওলার দাম বেধে গিয়েচে । আমি গান শনতে শুনতে সেই দিকে চেয়ে চেয়ে দেখি। মনে একটা অপদেব মুক্তির সােথ । বেলা সাড়ে দশটা কি এগারোটা-কলকাতা হলে এতক্ষণ ছািটতে হোত স্কুলে । রাটিন বাঁধা জীবন স্বপ্ন বলে মনে হচ্চে এই সদর পল্লীগ্রামের পদমফুলে ভরা জলাশয়ের তীরে প্রাচীন বটতলায় বসে । পিসিমার বাড়ি বেলা একটার সময় এসে পৌছে দেখি পিসিমা খেতে বসেচেন। আমিও স্নান করে এসে খেয়ে নিয়ে একটু বিশ্রাম করলাম। পিসিমার ঘরটাতে কেমন একটা পরানো পরানো গন্ধ পাওয়া যায়। ১৩oo সালের পরে আর এঘরে নতুন পাঁজি আসে নি ( ১৩oo সালে পিসেমহাশয় মারা গিয়েছিলেন ) । সেকালের গন্ধে, সেকালের আবহাওয়ায় ঘরটা ভত্তি’। কড়ির আলনা, সেকালের কাঁথা, কড়ির চুবড়ি, কাঁঠাল কাঠের সিন্দুক, গড়র মুক্তি বসানো পেতলের ঘন্টা, বেতের প’্যাটরা—যে সব জিনিস একালে কোনও বাড়িতে দেখা যায় না । একখানা কাশীদাসী মহাভারত আছে ১২৭৬ সালে ছাপা । অনেকক্ষণ ভয়ে ভয়ে সেই সব প্রাচীন দিনের বাতাসে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নিলাম, কত পরোনো দিনের কথা মনে হয়,--"যেদিন মেনকা পিসিমা আমার বল্যে বাবার ওপর রাগ করে এখানে চলে এসেছিলেন, বাবা এসে একবার কথকতা করেছিলেন । - বিকেলে হাটতলায় এক ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ হোল । ডাক্তারটি অত্যন্ত দুরবস্হাগ্ৰস্ত । একটা বাঁশের মাচায় মলিন শয্যা, একখানা ভাঙা টেবিল, গোটা বিশ-পাঁচশ শিশি, অন্যদিকে আর একটা মাচাতে এক বস্তা তামাক । একটুখানি বসবার পরই তিনি নিজের দুঃখের কাহিনী বলতে আরম্ভ করলেন । আজ চার মাস থেকে এখানে এক পয়সা রোজগার নেই । হাটখোলার মুজিবর মিঞার দোকানে চালডাল ধার নিয়ে আজ চার পাঁচ মাস চলচে । এদিকে বাড়িতে মেয়ের বিয়ের দিন স্হির হয়েছিল চৌঠো জ্যৈষ্ঠ । টাকা যোগাড় না করতে পারায় বিয়ে ওদিনে হয় নি। তারপর বললেন—দেখন এখানে একঘর বামন আছে, বেশ বড় গতিদার, তাদের বাড়ির এক বেী আজ চার মাস শয্যাগত, তা মশায় একবার ডাকে না । বলে ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে কি হবে, আমরা ফকির দেখাচি । হাটখোলার এক দোকানে এক মৌলবী সাহেব আমাদের ডাকাডাকি করলেন বলে গেলাম, —এখানকার মন্তবে তিনি নতুন মৌলবী হিসেবে এসেচেন । মাসে বারোটা টাকা পাবেন, হাটখোলাতে একটা মুসলমানদের দরগা ঘর আছে, সেখানেই" আপাততঃ থাকবেন। তাঁর মুখে মধুবাব সাব-ইনস্পেক্টরের গল্প শুনলাম। মধুবাব আমাদের কালে, আমরা যে পাঠশালায় পড়তাম, সেখানে গিয়ে আমায় একবার ‘গ্রন্থ" বানান জিজ্ঞেস করেছিলেন। সে ১৯o৫ সালের কথা হবে । সন্ধ্যার পরেই ব্যটি এল । আমি হাটখোলা থেকে চলে এলাম । রাত্রে একটা গোয়ালার ছেলে অনেক গল্পগুজব করলে । সকালে স্নান করে পিসিমার কাছে বিদায় নিয়ে পাটশিমলে মোহিনী কাকার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে রওনা হোলাম । আজ খাব রোদ উঠবে, আকাশ নীল, সকালের হাওয়ায় বিলের জল আর ধানের জাওলার গন্ধ । হাটখোলার ডাক্তার বাবর সঙ্গে দেখা করে মাঠের পথে হাঁটি। এদেশে যেখানে সেখানে আমগাছের তলায়, পিটুলি ফলের মত, দিব্যি বড় বড়