পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


२ কালের বাণী । অজ্ঞাত কালের ধ্যানলব্ধ বাণী যে মহান এবং কালের ব্যবধান মুছে ফেলে বতমান কালের শ্রোতার চিত্তরঞ্জন করছে তাতেই বুঝি সে-বাণীতে এমন কিছর আছে যা চিরন্তন । আধুনিক মানুষ পুরাতন মানুষ থেকে যতই পথক হক, চিরন্তন মানুষ থেকে পাথক নয়। আধুনিক মানুষের মধ্যে যে চিরন্তন মানুষ, বিভূতিভূষণের রচনার আবেদন অবশ্যই সেই চিরন্তন মানুষের কাছে পে"চেছে। | || ‘পথের পাঁচালী সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে । এই সত্যের জোর কি রবীন্দ্রনাথ তা সপণ্ট করে বলেন নি। এই সত্য কি বিষয়ের সত্য না প্রকাশের সত্য ? সম্ভবত উভয়ই । অনুমান করি, এই সত্য সহৃদয়তার, অকৃত্রিমতার এবং আন্তরিকতার। একথা শুধু 'পথের পাঁচালী সম্পকে নয়, বিভুতিভূষণের সমগ্র রচনাবলী সম্পকে বলা চলে যে, তাঁর রচনায় ঘটনা-বিন্যাসে পারিপাট্য নেই, আখ্যানের চমৎকারিত্ব নেই, চরিত্র-চিত্রণে অসাধারণত্ব নেই । প্রকরণগত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি অমনোযোগী, এমন কি ভাষা-ব্যবহারেও অসতক । তাঁর রচনাবলী দাঁড়িয়ে আছে সহৃদয়তা, আন্তরিকতা এবং অকৃত্রিমতার জোরে । তিঙ্গি সরে চড়ান নি, রং লেপেন নি, সাজিয়ে-বাজিয়ে বলেন নি, চোখে আঙ্গল দিয়ে দেখান নি। তিনি দেশহিতের বাণী প্রচার করেন নি, ইতিহাসের গহবরে প্রবেশ করেন নি, প্রেমের জটিলতা সন্টি করেন নি । আড়ম্বর এবং ছলাকলার কৌশল তাঁর অনায়ত্ত । এ-সবই বিভূতি-সাহিত্যের প্রকাশ-রীতির বৈশিষ্ট্য, বিষয়ের বৈশিষ্ট্য নয়, বিষয়ীরও নয়। কিন্তু প্রকাশ-রীতির এই বিশিষ্টতার মলে আছে শিল্পীর জীবন এবং শিল্পসাধনার এক গভীর সত্য-উপলব্ধি । এই সত্যোপলবিধ বিভূতিভূষণের জীবন এবং সাহিত্যে সহজের সর বেধেছে। তারই ফলে বিভুতি-সাহিত্যে চেনা জগতের নতন ব্যঞ্জনা, অকিঞ্চিৎকরের অপরাপ মহিমা । বিভূতিভূষণের জীবন এবং শিল্প দুইই এই সত্যোপলব্ধির সত্রে গ্রথিত ; তাঁর জীবনের উপলব্ধ সত্য তাঁর সাহিত্যেরও সত্য। তাই বিভূতিভূষণের জীবন এবং সাহিত্য পরস্পরের পরিপরক, একটি আর একটির ভাষ্য । সেদিক থেকে তিনি গীতিকবি । তাঁর জীবন তাঁর সাহিত্যের কেবলমাত্র পটভূমি নয়, তাঁর সাহিত্য-হম্যের চাবিকাঠি আছে তাঁর জীবনে । তাঁর জীবনের আলো ফেললে তাঁর সাহিত্যে নতন ব্যঞ্জনা জেগে উঠে । 欄 ○ | বিভূতিভূষণের জীবন এবং সাহিত্যের মলে সত্যোপলব্ধিকে সহজ ভাষায় বলতে পারি, প্রত্যক্ষ বাস্তব জগতের অতীত এক অতীন্দ্রিয় ভাবলোকের অস্তিত্ববোধ । বিভুতিভূষণ নিজে এই উপলব্ধির নাম দিয়েছিলেন ভাব-জীবন। একটি দিনলিপিতে এই ভাবজীবনের ইতিহাস অনুসন্ধান করে তিনি লিখেছেন, মনে হোল বহুকাল আগে শৈশবে হরি ঠাকুরদাদা সন্ধ্যাবেলা আমাদের বাড়ীর দরজা থেকে চাল চেয়ে না পেয়ে মলিন মথে ফিরে গিয়েচেন— সেই দিনটিতেই আমার ভাব-জীবনের বোধহয় আরম্ভ ' ( "তৃণাকুর", পৃ. ৫০-৫১)। মানষের প্রতি দুঃখবোধে এই ভাব-জীবনের উদ্বোধন, আনন্দময় চৈতন্যে এর পরিণতি। তাই বিভূতিভূষণের ভাবলোককে বলতে পারি, আনন্দময় ভাবলোক। বিভূতিভূষণের বিশ্বাস, সখ-দঃখ, হাসি-কান্না, জন্ম-মৃত্যু, দারিদ্র্য-মালিন্য নিয়ে যে জীবন-প্রবাহ তার অন্তরালের জীবনের আনন্দধারা নিত্য প্রবহমাণ “আমরা জীবনে এমন একটা জিনিস পেয়েচি, যা আমাদের এক মহতে সাংসারিক শাস্তি-দ্বন্ধের ওপরে এক শাশ্বত আনন্দ-জীবনের স্তরে