পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৮০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ অপর এক সপণ নতুন জীবন শহর হইল এ-দিনটি হইতে । এমন এক জীবন, যাহা সে চিরকাল ভালবাসিয়াছে, যাহার স্বপ্ন দেখিয়া আসিয়াছে। কিন্তু কোনদিন যে হাতের মঠায় নাগাল পাওয়া যাইবে তাহা ভাবে নাই । তাহাকে যে ড্রিল তাঁবর তত্ত্বাবধানে থাকিতে হইবে, তাহা এখান হইতে আরও সতেরোআঠারো মাইল দরে । মিঃ রায়চৌধুরী নিজের একটা ঘোড়া দিয়া তাহাকে পরদিনই কম"স্থানে পাঠাইয়া দিলেন। নতুন স্থানে আসিয়া অপর অবাক হইয়া গেল । বন ভালবাসিলে কি হইবে, এ ধরণের বন কখনও দেখে নাই। নিবিড় বনানীর প্রান্তে উচ্চ তৃণভূমি, তারই মধ্যে খড়ের বাংলোঘর, একটা পাতকুয়া, কুলীদের বাসের খপড়ি, পিছনে ও দক্ষিণে পাহাড়, সেদিকের ঘন বন কত দরে পয্যন্ত বিস্তৃত তাহা চোখে দেখিয়া আন্দাজ করা যায় না-ক্লোশের পর ক্লোশ ধরিয়া পাহাড়, একটার পিছনে আর একটা, আর গভীর জনমানবহীন অরণ্য, সীমা নাই, কুল-কিনারা নাই। চারদিকের দশ্য অতি গম্ভীর। তাঁবর ঠিক পিছনেই পাহাড় শ্রেণীর একটা স্থান আবার অনাবত, বেজায় খাড়া ও উচু-বিরাটকায় নগ্ন গ্রানাইট চড়াটা বৈকালের শেষ রোদে কখনও দেখায় রাঙা, কখনও ধন্সর, কখনও ঈষৎ তাম্রাভ কালো রংয়ের-এরপে গম্ভীর-দশ্য আরণ্যভূমির কল্পনাও জীবনে সে করে নাই কখনও ! 受 অপর সারাদিনের কাজও খুব পরিশ্রমের, সকালে স্নানের পর কিছু খাইয়াই ঘোড়ায় উঠিতে হয়, মাইল চারেক দরের একটা জায়গায় কাজ তদারক করিবার পর প্রায়ই মিঃ রায়চৌধুরীর ষোলো মাইল দরবতী তাঁবুতে গিয়া রিপোট করিতে হয় - তবে সেটা রোজ নয়, দু'দিন অন্তর অন্তর। ফিরিতে কোন দিন হয় সন্ধম, কোন দিন বা রাত্রি এক প্রহর দেড় প্রহর। সবটা মিলিয়া কুড়ি-পঁচিশ মাইলের চক্ৰ, পথ কোথাও সমতল, কোথাও ঢাল, কোথাও দ্বগম । ঢালটোতে জঙ্গল আছে তবে তার তলা অনেকটা পরিকার, ইংরাজীতে যাকে বলে open forest -কিন্তু পোয়াটাক পথ যাইতে না যাইতে সে মানুষের জগৎ হইতে সম্পণে বিচ্ছিন্ন হইয়া ঘন অরণ্যের নিজনতার মধ্যে একেবারে ডুবিয়া যায়—সেখানে জন নাই, মানুষ নাই, চারিপাশে বড় বড় গাছ, ডালে পাতায় নিবিড় জড়াজড়ি, পথ নাই বলিলেও হয়, কখনও ঘোড়া চালাইতে হয় পাহাড়ী নদীর শাক খাত বাহিয়া, কখনও গভীর জঙ্গলের দাভেদ্য বেত-বন ঠেলিয়া-যেখানে বনাশকের বা সম্বর হরিণের দল যাতায়াতের সড়ি পথ তৈরি করিয়াছে সে পথে । কত ধরণের গাছ, লতা, গাছের ডালে এখানেওখানে বিচিত্র রঙয়ের অকিড, নিচে য়্যাজোলিয়ার হলদে ফুল ফুটিয়া প্রভাতের বাতাসকে গন্ধভরাক্লাস্ত করিয়া তোলে। ঘোড়া চলাইতে চালাইতে অপর মনে হয় সে যেন জগতে সম্পণে একা, সারা দনিয়ার সঙ্গে তার কোন সম্পক' নাই – শ্ধ আছে সে, আর তাহার ঘোড়াটি ও চারিপাশের এই অপশব্দষ্ট বিজন বন! আর "কি নিৰঞ্জ'নতা ! কলিকাতার বাসায় নিঞ্জের বন্ধ-দয়ার ঘরটার কৃত্রিম নিৰঞ্জনতা নয়, এ ধরণের নিজ'নতার সঙ্গে তাহার কখনও পরিচয় ছিল না। এ নিজ'নতা বিরাট, অদ্ভুত, এমন কিছ, যাহা পৰ্ব হইতে ভাবিয়া অনুমান করা যায় না, অভিজ্ঞতার অপেক্ষা রাখে। ভারী পছন্দ হয় এ জীবন, গল্পের বইয়ে-টইয়ে যে রকম পড়িত, এ যেন ঠিক তাহাই । খোলা জায়গা পাইলেই ঘোড়া ছাড়িয়া দেয়, গতির আনন্দে সারা দেহে একটা উত্তেজনা আসে। খানাখন্দ, শিলা, পাইওরাইটের তুপ কে মানে ? নত শাল-শাখা এড়াইয়াদোদলামান অজানা লতার পাশ কাটাইয়া পৌরষে-ভরা উদামতার আনন্দে তাঁরবেগে ঘোড়া উড়াইয়া চলে ।