পাতা:বিভূতি রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড).djvu/৯৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৯৬ বিভূতি-রচনাবলী কলকাতায় পড়তে আসি, জায়গা ছিল না, তখন আপনারা জায়গা দিয়েছিলেন, সে কথা ভুলি নি এখনও । পরদিন দােপর পয্যন্ত সে ঘুমাইয়া কাটাইল । বৈকালের দিকে ভবানীপরে লীলার মামার বাড়ি গেল। অনেক দিন সে লীলার কোন সংবাদ জানে না—দর হইতে লাল ইটের বাড়িটা চোখে পড়িতেই একটা আশা ও উদ্বেগে বুক টিপ ঢিপ করিয়া উঠিল, লীলা এখানে আছে,—না নাই—যদি গিয়া দেখে সে আছে । সেই একদিন দেখা হইয়াছিল অপণার মৃত্যুর পাবে" । আজ আট বৎসর হইতে চলিল—এই দীঘ সময়ের মধ্যে আর কোন দিন দেখা হয় নাই । প্রথমেই দেখা হইল লীলার ভাই বিমলেন্দর সঙ্গে । সে আর বালক নাই, খুব লম্বা হইয়া পড়িয়াছে, মুখের চেহারা অন্য রকম দাঁড়াইয়াছে । বিমলেন্দ প্রথমটা যেন অপকে চিনিতে পারিল না, পরে চিনিয়া বৈঠকখানার পাশের ঘরে লইয়া বসাইল । দ্য পাঁচ মিনিট এ-কথা ও-কথার পরে অপর যতদূরে সম্ভব সহজ স্বরে বলিল—তারপর তোমার দিদির খবর কি—এখানে না শ্বশুরবাড়ি ? বিমলেন্দ কেমন একটা আশ্চৰ্য্য সরে বলিল—ও, ইয়ে আসনে আমার সঙ্গে—চলন । কেমন একটা অজানা আশংকায় অপর মন ভরিয়া উঠিল, ব্যাপার কি ? একটু পরে গিয়া বিমলেন্দ রাস্তার মোড়ে দাঁড়াইয়া নীচু স্বরে বলিল—দিদির কথা কিছু শোনেন নি আপনি ? অপর উদ্বিগ্নমুখে বলিল—না—কি ? লীলা আছে তো ? —আছেও বটে, নেইও বটে। সে সব অনেক কথা, আপনি ফ্যামিলির ফ্রেড বলে বলছি । দিদি ঘর ছেড়েছে । স্বামী গোড়া থেকেই ঘোঁর মাতাল—অতি কু-চরিত্র । বেণ্টিক স্ট্রীটের এক ইহুদী মেয়েকে নিয়ে বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দিলে—তাকে নিজের বাসাতে রাত্রে নিয়ে যেতে শুরু করলে । দিদিকে জানেন তো ? তেজী মেয়ে, এ সব সহ্য করার পাত্রী নয়—সেই রাত্রেই ট্যাক্সি ডাকিয়ে পদ্মপুকুরে চলে আসে নিজের ছোট মেয়েটাকে নিয়ে। মাস দুই পর একদিন দাদাবাব এল, মেয়েকে সিনেমা দেখাবার ছতো ক'রে নিয়ে গেল জব্বলপরে---আর দিদির কাছে পাঠায় না । তারপর দিদি যা করেছে—সে যে আবার দিদি করতে পারত তা কখনও কেউ ভাবে নি। হীরক সেনকে মনে আছে ? সেই যে ব্যারিস্টার হীরক সেন, আমাদের এখানে পাটিতে দেখেছেন অনেকবার । সেই হীরক সেনের সঙ্গে দিদি একদিন নিরদেশ হয়ে গেল। এক বৎসর কোথায় রইল—আজকাল ফিরে এসেছে, কিন্তু হীরক সেনকে ছেড়েছে । একা আলিপুরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে । এ বাড়িতে তার নাম আর করার উপায় নেই । মা কাশীবাসিনী হয়েছেন, আর আসবেন না । কথা শেষ করিয়া বিমলেন্দ নিজেকে একটু সংযত করার জন্যই বোধ হয় একটু চুপ করিয়া রহিল। পরে বলিল,—হীরক সেন কিছল না—এ শুধু তার একটা শোধ তোলা মাত্র, সেন তো শুধ উপলক্ষ । আচ্ছা, তবে আসি অপৰপ’বাব, এখন কিছ দিন থাকবেন তো এখানে ?—বিমলেন্দ চলিয়া যায় দেখিয়া অপর কথা খুজিয়া পাইল, তাড়াতাড়ি তাহার হাতখানা ধরিয়া অকারণে বলিল—শোনো, শোনে, লীলা আলিপরে আছে তা হলে ? এ প্রশ্ন সে করিতে চাহে নাই, সে জানে এ প্রশ্নের কোন অথ* নাই । কিন্তু এক সঙ্গে এত কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা হইতেছিল—কোনটা সে জিজ্ঞাসা করিবে ? বিমলেন্দ বলিল,—এতে আমাদের যে কি মন্মান্তিক—বন্ধমানে আমাদের বাড়ির সেই নিস্তারিণী বিকে মনে আছে ? সে দিদিকে ছেলেবেলায় মানুষ করেছে, পুজোর সময় বাড়ি গেলাম, সে ভেউ-ভেউ করে কাঁদতে লাগল। সে-বাড়িতে দিদির নাম পৰ্য্যস্ত করার জো নেই। রমেনদা আজকাল বাড়ির মালিক, বুঝলেন না ? দিদিও সাথে নেই, বলবেন না কাউকে,