পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/১১১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


অপরাজিত じ"? দাড়াইয়াছিল। কলেজের মধ্যে এইরূপ একজন মুগ্ধ ভক্ত পাইয়া অপু মনে মনে গর্ব অনুভব করিয়াছিল বটে, কিন্তু সে-ই তাহার পুরাতন মুখচোরা রোগ! তবে তাহার পক্ষে একটু সাহসের বিষয় এই দাড়াইল যে, ছেলেটি তাহার অপেক্ষাও লাজুক। অপু গিয়া তাহার সম্মুখে দাড়াইয়৷ কিছুক্ষণ ইতস্তত: করিয়া তাহার হাত ধরিল। কিছুক্ষণ কথাবার্ত হইল। কেহই কাগজে লেখা পঙ্গটার কোনও উল্লেখ করিল না, যদিও দুজনেই বুঝিল যে, তাহদের আলাপের মূলে কালকের সেই চিঠিখানা। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি বলিল,—চলুন কোথাও বেড়াতে যাই, কলকাতার বাইরে কোথাও মাঠে—শহরের মধ্যে ইপি ধরে—কোথাও একটা ঘাস দেখবার জো নেই– ' কথাটা শুনিয়াই অপুর মনে হইল, এ ছেলেটি তো সম্পূর্ণ অন্য প্রকৃতির। ঘাস না দেখিয়া কষ্ট হয় এমন কথা তো আজ প্রায় এক বৎসর কলিকাতার অভিজ্ঞতায় কলেজের কোন বন্ধুর মুখে শোনে নাই। সাউথ সেক্শনের ট্রেনে গোটাচারেক স্টেশন পরে তাহারা নামিল। অপু কখনও এদিকে আসে নাই। ফাক মাঠ, কেয়া ঝোপ, মাঝে মাঝে হোগলা বন । সরু মেঠো পথ ধরিয়া দুজনে ইটিয়া চলিতেছিল—ট্রেনের অল্প আধঘণ্টার আলাপেই দু'জনের মধ্যে একটা নিবিড় পরিচয় জমিয়া উঠিল। মাঠের মধ্যে একটা গাছের তলায় ঘাসের উপরে দুজনে গিয়া বসিল । ছেলেটি নিজের ইতিহাস বলিতেছিল— হাজারিবাগ জেলায় তাহাদের এক অভ্রের খনি ছিল, ছেলেবেলায় সে সেখানেই মানুষ । জায়গাটার নাম বড়বনী, চারিধারে পাহাড় আর শাল-পলাশের বন, কিছু দূরে দারুকেশ্বর নদী ! নিকটে পাহাড়ের গায়ে একটা ঝর্ণ। পড়ন্ত বেলায় শালবনের পিছনের আকাশটা কত কি রঙে রঞ্জিত হইত—প্রথম বৈশাখে শাল-কুমুমের ঘন সুগন্ধ দুপুরে রৌদ্রকে মাতাইত, পলাশবনে বসন্তের দিনে যেন ডালে ডালে আরডির পঞ্চপ্রদীপ জলিত—সন্ধ্যার পরই অন্ধকারে গা ঢাকিয়া বাঘেরা আসিত ঝর্ণার জল পান করিতে—বালো হইতে একটু দূরে বালির উপর কতদিন সকালে বড় বড় বাঘের পায়ের থাবার দাগ দেখা গিয়াছে। সেখানকার জ্যোৎস্না রাত্রি! সে রাত্রির বর্ণনা নাই, ভাষা যোগায় না। স্বর্গ যেন দূরের নৈশ-কুয়ালাচ্ছন্ন অস্পষ্ট পাহাড়শ্রেণীর ওপারে—ছায়াহীন, সীমাহীন, অনন্তরস-ক্ষর জ্যোৎস্না যেন দিকৃচক্রবালে তাহারই ইঙ্গিত দিত। এক-আধদিন নয়, শৈশবের দশ দশটি বৎসর সেখানে কাটিয়াছে। সে অস্ত জগৎ, পৃথিবীর মুক্ত প্রসারতার রূপ সেখানে চোখে কি মায়া-অঞ্জন মাথাইরা দিয়াছে,—কোথাও আর ভাল লাগে না ! অভ্রের খনিতে লোকসান হইতে লাগিল, খনি অপরে কিনির লইল, তাহার পর হইতেই কলিকাতায় । মন হাপাইরা ওঠে—খাচার পাখির মত ছটফট করে। বাল্যের সে অপূর্ব জানন্ম মন হইতে নিশ্চিহ্ন হইরা মূছিয়া গিয়াছে। অপু এ ধরণের কথা কাহারও মুখে এ পর্যন্ত শোনে নাই—এ যে তাঁহারই অন্তরের কথার