পাতা:বিভূতি রচনাবলী (দ্বিতীয় খণ্ড).djvu/১৪৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


〉》bア বিভূতি-রচনাবলী কলিকাতায় নূতন আসিয়া অবলম্বন-শূন্ত অবস্থায় পথে পথে ঘুরিতে হইয়াছিল, কি না জানি হয়, কোথায় না জানি কি স্ববিধা জুটিবে—এবারও তাই। ঔষধের কারখানায় এবার আর স্থান হয় নাই। এক বন্ধুর মেসে দিনকতক উঠিয়াছিল, এখন আবার অন্য একটি বন্ধুর মেসে আছে। নানাস্থানে ছেলেপড়ানোর চেষ্টা করিয়া কিছুই জুটিল না, পরের মেসেই বা চলে কি করিয়া? তাহা ছাড়া এই বন্ধুটির ব্যবহার তত ভাল নয়, কেমন যেন বিরক্তির ভাব সর্বদাই—তাহার অবস্থা সবই জানে অথচ একদিন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া বসিল, সে মেস খুঁজিয়া লইতে এত দেরি কেন করিতেছে—এ মাসটার পরে আর কোথাও সিট কি খালি পাওয়া যাইবে ? অপু মনে বড় আহত হইল। একদিন তাহার হঠাৎ মনে হইল খবরের কাগজ বিক্রয় করিলে কেমন হয় ? কলিকাতার খরচ চলে না ? মাকেও তে।-- অপু সব সন্ধান লইল। তিন পয়সা দিয়া নগদ কিনিয়া আনিতে হয় খবরের কাগজের অফিস হইতে, চার পয়সার বিক্রী, এক পয়সা লাভ কাগজ পিছু ; কিন্তু মূলধন তো চাই ; কাহারও কাছে হাত পাতিতে লজ্জা করে, দিবেই বা কে ? এই কলিকাতা শহরে এমন একজনও নাই যে তাহাকে টাকা ধার দেয়। সে সুদ দিতে রাজী আছে। সমীরের কাছে যাইতে ইচ্ছা হয় না, সে ভাল করিয়া কথা কয় না ! ভাবিয়া-চিন্তিয়া অবশেষে কারখানার তেওয়ারী-বৌয়ের কাছে গিয়া সব বলিল। তেওয়ারী-বেী স্থা লইবে না। লুকাইয়া দুটা মাত্র টাকা বাহির করিয়া দিল, তবে আশ্বিন মাসে তাহারা দেশে যাইবে, তাহার পূর্বে টাকাটা দেওয়া চাই। ফিরিবার পথে অপু ভাবিল’বছর পায়ের ধুলো নিতে ইচ্ছে করে, মায়ের মত দ্যাখে, আহা কি ভালো লোক ! পরদিন সকালে সে ছুটিল অমৃতবাজার পত্রিকা অফিসে ! সেখানে কাগজ-বিক্রেতাদের মারামারি, সবাই আগে কাগজ চায়। অপু ভিড়ের মধ্যে ঢুকিতে পারিল না—কাগজ পাইতে বেলা হইয়া গেল। তাহার পর আর এক নূতন বিপদ-অন্য কাগজওয়ালাদের মত কাগজ স্থাকিতে পারা তো দূরের কথা, লোকে তাহার দিকে চাহিলে সে সঙ্কুচিত হইয়া পড়ে, গলা দিয়া কোনও কথা বাহির হয় না। সকলেই তাহার দিকে চায়, স্বত্র সুন্দর ভদ্রলোকের ছেলে কাগজ বিক্রয় করিতেছে, এ দৃশু তখনকার সময়ে কেহ দেখে নাই—অপু ভাবে—বা রে, আমি কি চড়কের নতুন সঙ, নাকি ? খানিক দূরে আর একটা জায়গায় চলিয়া যায়। কাহাকেও বিনীতভাবে মুখের দিকে না চাহিয়া বলে—একখানা খবরের কাগজ নেবেন? অমৃতবাজার ? কলেজে যাইবার পূর্বে মাত্র আঠারোখানি বিক্রয় হইল। বাকীগুলি এক খবরের কাগজের ফেরিওয়াল তিন পয়সা দূরে কিনিয়া লইল । পরদিন লজ্জাট অনেকটা কমিল, ট্রামে অনেকগুলি কাগজ কাটিল, বোধ হয় বাঙালী ভদ্রলোকের ছেলে বলিয়াই তাহার নিকট হইতে অনেকে কাগজ লইল । মাসের শেষে একদিন কলেজ লাইব্রেরীতে সে বসিয়া আছে, হঠাৎ হলে খুব হৈ-চৈ উঠিল।